আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। গত পাঁচ বছরে দেশে পণ্যটির উৎপাদন বেড়েছে ৫১ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৩০ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে কমেছে আমদানির পরিমাণ। সর্বশেষ অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি নেমে এসেছে ৮৬ হাজার ৩৯৮ টনে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত আমদানির প্রয়োজন হয়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল ২৫ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টনে। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ২৯ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩২ লাখ ২১ হাজার ৪৩১ টন। আর সর্বশেষ অর্থবছরে উৎপাদন ৩৮ লাখ টন ছাড়িয়েছে।
উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে উন্নত জাতের বীজ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ সম্প্রসারণ, গবেষণা এবং কৃষকদের আগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ায় মৌসুমের বাইরে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখাও সহজ হচ্ছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসানে পড়েছেন কৃষকরা। দীর্ঘদিন দাম কম থাকলে পেঁয়াজ চাষে তাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আবারও আমদানিনির্ভরতা তৈরির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে পেঁয়াজের তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা এ ফসলের আবাদ বাড়িয়েছেন। ফলে উৎপাদন বেড়েছে, আমদানি কমেছে এবং বাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। তবে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কৃষকের লোকসান কমানো জরুরি। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের উৎপাদনে ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে উৎপাদন পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ৬ লাখ ২ হাজার ২৯ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৭ লাখ ৫১ হাজার টনে দাঁড়ায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি কমে হয় ৬ লাখ ৫ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি ছিল প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার টন। সর্বশেষ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৮৬ হাজার ৩৯৮ টনে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। সংরক্ষণ ও পরিবহনজনিত অপচয় বিবেচনায় নিলে প্রকৃত চাহিদা দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টনে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে পেঁয়াজের সংগ্রহ-পরবর্তী অপচয়ের হার ২৫ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চলতি বছর দেশে সংরক্ষিত পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ টনে। সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে কৃষকদের মধ্যে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করছে সরকার। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চার হাজার এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়। গত অর্থবছরে দুই কিস্তিতে বিতরণ করা হয়েছে ১৯ হাজার মেশিন। এ ছাড়া অন্য কর্মসূচির আওতায় দেওয়া হয়েছে আরও ৩ হাজার ৭০০টি। সব মিলিয়ে কৃষক পর্যায়ে ২৭ হাজার ৭০০টি এয়ার ফ্লো মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণের সক্ষমতা বেড়েছে প্রায় তিন লাখ টন।
পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে উন্নত জাত উদ্ভাবনেও অগ্রগতি হয়েছে। মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বগুড়ার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. মাসুদ আলম বলেন, আগে সাধারণত শীতকালেই পেঁয়াজের আবাদ হতো। এখন গ্রীষ্মকালেও পেঁয়াজ চাষ হচ্ছে। গবেষণার মাধ্যমে বড় আকারের ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করায় হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। বারি-৪ ও বারি-৬ জাতের একেকটি পেঁয়াজের ওজন ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। বারি-২, ৩ ও ৪ জাতের পেঁয়াজ সারা বছর চাষ করা সম্ভব। এসব জাতের কারণে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে এবং আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমেছে।
উৎপাদন বাড়ায় বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহও বেড়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গতকাল রাজধানীতে পণ্যটির দাম ছিল ৪০ থেকে ৬০ টাকা। গত বছরের ৫ নভেম্বর এ দাম ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। ২০২৪ সালের একই দিনে দেশী পেঁয়াজের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা এবং আমদানীকৃত পেঁয়াজের দাম ছিল ৮৫ থেকে ১২০ টাকা।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে। সরকারের লক্ষ্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ রফতানির সক্ষমতা অর্জন করা। এ জন্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। উন্নত বীজ সরবরাহ, গবেষণা এবং এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেঁয়াজ উৎপাদনে সাম্প্রতিক অগ্রগতি ধরে রাখতে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো, সংরক্ষণব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে অতিরিক্ত উৎপাদনে কৃষক লোকসানে পড়তে পারেন, যা ভবিষ্যতে আবাদ কমিয়ে আবারও আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে পারে।