সুদহার অপরিবর্তিত, ১৯ বছরের সর্বোচ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ব্যয়
টানা পঞ্চম বৈঠকেও নীতিগত সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। তবে এ সিদ্ধান্তের পরই দেশটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যয় ১৯ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও আরও বেড়েছে।
ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেডের সিদ্ধান্তের পর ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যয় নির্ধারণে এ ইল্ডকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়। ইল্ড বাড়লে সরকার, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের জন্য ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যায়।
এবারের বৈঠকেও ফেড নীতিগত সুদহার ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ধরনের শিথিল অবস্থানে নেই।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার না বাড়ালেও বাজার নিজেই ঋণের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। জুন ও জুলাইয়ের মধ্যে বন্ড ও শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের খরচ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
তবে ফেডের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি অনেক বিনিয়োগকারী। তাদের প্রশ্ন, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়লে সুদহার অপরিবর্তিত রাখার যৌক্তিকতা কী।
ডিআরডব্লিউ ট্রেডিংয়ের অর্থনৈতিক কৌশলবিদ লু ব্রায়েন বলেন, ফেডের বক্তব্য বাজারকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন পিজিআইএমের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট সকিন। তার মতে, সুদহার না বাড়ানোর কারণ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারাই ছিল সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
ফেডের সিদ্ধান্তের পর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ডবাজারে ভিন্ন প্রবণতা দেখা গেছে। দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড কিছুটা কমে পরে ৪ দশমিক ২৮ শতাংশে স্থিত হয়। অন্যদিকে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, স্বল্পমেয়াদে সুদহার স্থিতিশীল থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়বে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপের বন্ডবাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। জার্মানির ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের একই মেয়াদের বন্ডের ইল্ড ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেডের নীতিনির্ধারণী সংস্থা ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির ভেতরেও মতপার্থক্য রয়েছে। কমিটির তিন সদস্য এবার সুদহার বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
বার্কলেজের অর্থনীতিবিদ মার্ক জিয়ানোনি বলেন, সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও ফেডের নীতিগত অবস্থান এখনো কঠোর। কমিটির ভেতরে সুদহার বৃদ্ধির পক্ষে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি নয়, পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বৃদ্ধিও মূল্যচাপ ধরে রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মে মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে ফেডের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২ শতাংশ। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি।