এস আলমের পর আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে কেডিএস
নতুন পর্ষদ ঘিরে বিতর্ক, পুরোনো উদ্যোক্তাদের প্রত্যাবর্তনে প্রশ্ন; চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের ফেরানোর চেষ্টার অভিযোগ
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের পর আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন পর্ষদে শেয়ারধারী উদ্যোক্তাদের ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে ব্যাংকটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আবারও চলে গেছে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী কেডিএস গ্রুপের হাতে। তবে পর্ষদ পুনর্গঠনের পর থেকেই ব্যাংকটিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পর্ষদে অন্তর্ভুক্তি, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের পুনর্বহালের উদ্যোগ এবং একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের (ডিএমডি) পদত্যাগকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটিতে আবারও পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এ নিয়ে আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
স্বতন্ত্র পর্ষদ ভেঙে পুরোনো মালিকদের প্রত্যাবর্তন
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি ব্যাংকের মতো আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও ভেঙে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা শাহরিয়ার।
স্বতন্ত্র পরিচালকদের নেতৃত্বে গত প্রায় দুই বছর ব্যাংকটির আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ সময় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষ নিরীক্ষা চালিয়ে ঋণ বিতরণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট প্রশাসনে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সক্রিয় হয়ে ওঠে দুটি পক্ষ। শেষ পর্যন্ত সরকার শেয়ারধারী উদ্যোক্তাদের হাতে ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী ১৫ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে।
কেডিএসের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি
নতুন ১৪ জন পরিচালক নিয়োগের মধ্যে ছয়জনই কেডিএস গ্রুপ অথবা গ্রুপটির মালিক পরিবারের সদস্য ও প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি। তাদের মধ্যে রয়েছেন কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, তাঁর ছেলে সেলিম রহমান, ভাই আহমেদুল হক, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং কেওয়াই স্টিল মিলসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম।
তবে একই পরিবার বা গ্রুপ থেকে তিনজনের বেশি পরিচালক রাখার সুযোগ না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নেননি। পরে তাঁদের পরিবর্তে নতুন পরিচালক হিসেবে খন্দকার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান।
প্রথম বৈঠকেই বিতর্ক
নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন অনুষ্ঠিত হয় জরুরি বোর্ড সভা। ব্যাংকের একাধিক পরিচালক ও কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সভায় অনিয়মের অভিযোগে আগে চাকরিচ্যুত কয়েকজন কর্মকর্তাকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। এছাড়া সভাকক্ষে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন পর্ষদের কয়েকজন সদস্য ইতোমধ্যে অতীতে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের পুনর্বহালের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে গত দুই বছরে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।
এদিকে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও চেয়ারম্যান বদিউর রহমান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন পর ব্যাংকে ফিরে এসেছি। এখন আমার মূল দায়িত্ব ব্যাংকটিকে পেশাদারির সঙ্গে পরিচালিত করা, যাতে নতুন করে কোনো অনিয়ম না হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাঁদের চাকরি গেছে, তাঁদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। চেয়ারম্যান হিসেবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই আমার প্রধান দায়িত্ব।”
ডিএমডির পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল এবং পরিচালনা পর্ষদ থেকে কোনো চাপ দেওয়া হয়নি।
সরকারের চাপে সিদ্ধান্ত?
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্রের দাবি, কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও সরকার চাইছিল প্রকৃত শেয়ারধারীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতে। তবে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের কারণেই ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অতীতের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন
কেডিএস গ্রুপের সঙ্গে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সম্পর্ক নতুন নয়। এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের সময়ও কেডিএস গ্রুপ ব্যাংকটির পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে আসে, সাবেক চেয়ারম্যানদের ব্যবহারের জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি বিলাসবহুল মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ি কেনা হয়েছিল।
তদন্ত অনুযায়ী, ২০২২ সালে সেলিম রহমানের জন্য এক কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন থাকলেও প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে গাড়ি কেনা হয়। একইভাবে ২০২৩ সালে এস আলমের ভাই ও তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ লাবুর জন্য প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে আরেকটি গাড়ি কেনা হয়, যার কোনো অনুমোদন ছিল না।
অভিযোগ রয়েছে, গাড়ি দুটি ব্যাংকের নামে নিবন্ধন না করে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধন করা হয় এবং ব্যয়ের হিসাবও বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গোপন রাখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে পরে গাড়ি দুটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ন্যাশনাল ব্যাংকের অভিজ্ঞতাও আলোচনায়
কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে অপসারণ করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
এমন একজন ব্যক্তিকে আবার একটি বড় বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থা
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৫৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণ ও বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ হাজার ১২১ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত বছর নিট মুনাফা হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। তবে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি। এর ফলে ব্যাংকটির শেয়ার বর্তমানে পুঁজিবাজারে ‘জেড’ শ্রেণিতে রয়েছে।
সারা দেশে ব্যাংকটির ২২৬টি শাখায় প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, শেয়ারধারীদের পরিচালনায় ব্যাংক পরিচালনা হওয়াই স্বাভাবিক। তবে অতীতের কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে পরিচালক নিয়োগ করা উচিত।
তিনি বলেন, “নতুন করে এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হবে না, যাঁরা ব্যাংকের জন্য ন্যূনতম ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আবার কোনো প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে, তবে সেটি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে।”
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের নতুন পর্ষদ ভবিষ্যতে কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে ব্যাংকটির সামনে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।