স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর জামিয়া মোহাম্মাদীয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীদের জন্য শুক্রবারের দিনটি এখন অন্য দিনের চেয়ে কিছুটা আলাদা। জুমার নামাজের পর বিশেষ খাবারের আয়োজন থাকে। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় খাবারের প্যাকেট। সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে খাবার গ্রহণের এই আয়োজন তাদের নিয়মিত জীবনে যোগ করে বাড়তি আনন্দ।
শুধু খাবার দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এ উদ্যোগ। এর সঙ্গে রয়েছে যত্ন, সম্মান ও সামাজিক সম্পৃক্ততার বার্তা। আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপের (এবিজি) ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরের উদ্যোগে নিয়মিতভাবে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য এ ধরনের কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানায় জুমার নামাজের পর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ খাবার ও আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়। রাজধানীর চারটি মাদ্রাসায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয় বলে জানিয়েছে এবিজি ফাউন্ডেশন।
জামিয়া মোহাম্মাদীয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বসবাসরত প্রায় আড়াইশ শিক্ষার্থীর জন্যও ছিল এমন আয়োজন। পড়াশোনা, হিফজ ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি নিয়মিত জীবনে একটি বিশেষ দিনের আনন্দ তাদের মধ্যে তৈরি করেছে এ উদ্যোগ।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবারের আয়োজন তাদের কাছে আনন্দের একটি উপলক্ষ। বিশেষ খাবারের জন্য তারা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে। খাবার হাতে পাওয়ার পর সহপাঠীদের সঙ্গে বসে খাওয়ার মুহূর্তটিও তাদের কাছে আনন্দের।
এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘শুক্রবারের বিশেষ খাবারের জন্য আমরা অপেক্ষা করি। সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে ভালো লাগে। যারা আমাদের জন্য এই আয়োজন করেন, তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’
তার ভাষায়, এ ধরনের আয়োজন শুধু খাবারের বিষয় নয়। যারা দূরে থেকেও তাদের কথা মনে রাখেন এবং সময় ও সামর্থ্য দিয়ে পাশে দাঁড়ান, তাদের প্রতি শিক্ষার্থীদের আলাদা এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়।
মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল লতিফ ফারুকী বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন তাদের মধ্যে আনন্দ তৈরি করে। একই সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তাদের একটি ইতিবাচক সংযোগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ‘শিশুদের শুধু প্রয়োজনের দিক দিয়ে দেখলে হবে না। তাদের সম্মান, আত্মমর্যাদা ও মানসিক আনন্দের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যখন তাদের জন্য সময় দেন, ভালো খাবারের আয়োজন করেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে পাশে থাকেন, তখন তারা নিজেদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অনুভব করে।’
মাওলানা আব্দুল লতিফ ফারুকী সায়েম সোবহান আনভীর ও এবিজি ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, নিয়মিত সহযোগিতার কারণে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো আনুষ্ঠানিকতা কিংবা প্রচারের প্রত্যাশা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন সায়েম সোবহান আনভীর।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের আয়োজন নিয়মিত হওয়ায় তারা এর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। শুক্রবার এলেই তারা আয়োজনটির জন্য অপেক্ষা করে। তাদের আনন্দ দেখাটাই আমাদের জন্য বড় বিষয়।’
তার মতে, সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে নিয়মিততা গুরুত্বপূর্ণ। একদিনের আয়োজনের পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে মানুষের পাশে থাকার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে প্রকাশ পায়।
এবিজি ফাউন্ডেশনের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ গাজী বাদল বলেন, ‘এবিজি ফাউন্ডেশন একটি সামাজিক ও কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। প্রতি সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় রাজধানীর চারটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসম্মত খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত খাবার বিতরণ করা হয়। ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, সায়েম সোবহান আনভীরের উদ্যোগে প্রতি শুক্রবার অন্তত ১ হাজার ৫০০ মানুষ এবং ৫০০ শিক্ষার্থীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্যও এ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতেও অংশ নেয় এবিজি ফাউন্ডেশন। পবিত্র রমজান মাসে সাহরি ও ইফতার বিতরণ, কোরবানির ঈদে মাংস বিতরণ, শীতকালে শীতবস্ত্র প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
এসব কার্যক্রমের একটি বড় দিক হলো ধারাবাহিকতা। বিশেষ কোনো দিন বা উৎসবকে কেন্দ্র করে এককালীন সহায়তার পরিবর্তে নিয়মিতভাবে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছে ফাউন্ডেশনটি। ফলে উপকারভোগীদের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সম্পর্কও তৈরি হচ্ছে।
সায়েম সোবহান আনভীরের ব্যক্তিগত উদ্যোগেও বিভিন্ন সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নজির রয়েছে। নিজের বিশেষ দিনগুলোতেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ও শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ব্যক্তিগত আনন্দকে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার এই মানসিকতাকে তার সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে দেখছেন তারা।
সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে বর্তমানে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মানুষের মর্যাদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সহায়তার পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সংযোগ তৈরির সুযোগ করে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আয়োজন সেই জায়গায়ও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষকরা।
জামিয়া মোহাম্মাদীয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য শুক্রবারের আয়োজন তাই শুধু একটি খাবার বিতরণ কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং এর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সমাজের অন্য অংশের মানুষের একটি আন্তরিক যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। একটি খাবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা অনুভব করছে, তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সমাজের মানুষেরও আগ্রহ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য এমন উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ। মাদ্রাসার নিয়মিত পড়াশোনা ও অন্যান্য কার্যক্রমের বাইরে বিশেষ খাবারকে কেন্দ্র করে সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া তাদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা যোগ করে।
মাদ্রাসার শিক্ষকরা মনে করেন, শিশুদের বিকাশের জন্য শুধু পাঠ্যক্রম বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ, সামাজিক যোগাযোগ এবং আনন্দের পরিবেশও প্রয়োজন। পরিবারের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি। তাই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোতে তাদের প্রয়োজনকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।![]()
সায়েম সোবহান আনভীরের উদ্যোগে পরিচালিত কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এখানে শিক্ষার্থীদের শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, সমাজেরই একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাদের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে এবং নিয়মিতভাবে তাদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়িক পরিচয়ের বাইরে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ভূমিকা সায়েম সোবহান আনভীরের সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পাশাপাশি এবিজি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা, উৎসব ও মৌসুমি প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার এই ধারণা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—উভয়ের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ যুক্ত হলে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। বিশেষ করে শিক্ষা ও শিশুদের নিয়ে কাজ করলে সেই প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়তে পারে।
এ কারণে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত খাবারের আয়োজনকে শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে না দেখে সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এমন কার্যক্রম শিশুদের মধ্যে আত্মমর্যাদার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে এবং সমাজের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
শুক্রবারের খাবারের আয়োজন শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা আবার ফিরে যায় তাদের নিয়মিত পড়াশোনায়। কিন্তু দিনের বিশেষ আয়োজন তাদের মধ্যে রেখে যায় আনন্দের স্মৃতি। পরের শুক্রবারের অপেক্ষাও শুরু হয় সেখান থেকেই।
একটি ভালো উদ্যোগের সার্থকতা অনেক সময় বড় কোনো পরিসংখ্যানে নয়, বরং মানুষের জীবনে তৈরি হওয়া ছোট ছোট ইতিবাচক মুহূর্তে প্রকাশ পায়। একজন শিক্ষার্থীর মুখের হাসি, সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া কিংবা বিশেষ একটি দিনের জন্য অপেক্ষা—এসবই সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তাই সহায়তার পাশাপাশি সম্মান ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেক শিশুই তার পরিচয়, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া মানে শুধু বর্তমানকে সহায়তা করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব পালন করা।
সায়েম সোবহান আনভীর ও এবিজি ফাউন্ডেশনের ধারাবাহিক উদ্যোগ সেই জায়গাতেই একটি বার্তা দিচ্ছে—সামাজিক দায়িত্ব কেবল দান বা সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের পাশে থাকা, তাদের আনন্দের অংশ হওয়া এবং তাদের মর্যাদাকে সম্মান করা।
আর সেই মানবিক উদ্যোগের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি হয়তো কোনো আয়োজনের মঞ্চে নয়; বরং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার মুহূর্তে, সহপাঠীর সঙ্গে হাসি ভাগ করে নেওয়ার সময়ে কিংবা পরের শুক্রবারের জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করার মধ্যে। সেই হাসিই হয়ে ওঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।