নিজস্ব প্রতিবেদক
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় চলতি বছর পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই এ হার সর্বনিম্ন। ২০০৭ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এরপর বিভিন্ন সময়ে পাসের হার ওঠানামা করলেও চলতি বছর তা আবারও বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে।
গত বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সঙ্গে কমেছে সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থী। পাস করা মোট শিক্ষার্থীর হিসাবে জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
শিক্ষাব্যবস্থার ফলাফল বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর ফলাফলে পাসের হারের বড় ধরনের ওঠানামা শিক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি এবং নম্বর প্রদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রভাব ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি পাসের হার দেখানোর প্রবণতা ছিল। সরকারের সাফল্য তুলে ধরতে শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র মূল্যায়নে নম্বর বাড়িয়ে দেয়া এবং প্রকৃত ফলাফল আড়াল করার অভিযোগও ওঠে। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছিল সীমিত।
শিক্ষাবোর্ড কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়। পরীক্ষকদের কোনো ধরনের গ্রেস নম্বর না দেয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল। এর প্রভাব পড়ে ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে। ওই বছর পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং বিগত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নামে।
চলতি বছরের ফলাফল সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। যদিও ২০২৫ সালের তুলনায় ফলাফলের বিভিন্ন সূচকে পরিবর্তন রয়েছে, সামগ্রিক পাসের হার এখনো আগের উচ্চ অবস্থান থেকে অনেক নিচে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। পরের বছর ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশে। ২০২৪ সালে আবার কিছুটা বেড়ে পাসের হার হয় ৮৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এরপর ২০২৫ সালে বড় ধরনের পতনের পর চলতি বছরও পাসের হার ৬০ শতাংশের ঘরে রয়েছে।
ফলাফলের এই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকে শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা বা প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের মানদণ্ড, পরীক্ষকদের নম্বর প্রদানের প্রবণতা এবং পরীক্ষার পরিবেশ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব ফলাফলে পড়ে।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এবার কৃতকার্য হতে পারেনি।
চলতি বছরের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২১ এপ্রিল। এসএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয় ২০ মে। দাখিল এবং এসএসসি ও ভোকেশনালের তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয় ২৪ মে। এরপর উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফলাফল প্রস্তুতের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজ ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষার ফলাফলকে রাজনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতার সূচক হিসেবে বিবেচনা না করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা ও শিক্ষার মান পরিমাপের মাধ্যম হিসেবে দেখা প্রয়োজন। পাসের হার কমে যাওয়াকে তাই একদিকে যেমন শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অতিরিক্ত নম্বর প্রদানের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
তবে পাসের হার কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, বোর্ডভিত্তিক পার্থক্য, অনুত্তীর্ণের কারণ এবং আগের বছরগুলোর সঙ্গে মূল্যায়ন পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। শুধু সামগ্রিক পাসের হার দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চিত্রের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
এবারের ফলাফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যাওয়ায় উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতায় এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শীর্ষস্থানীয় কলেজগুলোয় ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে আসনসংখ্যা ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর অনুপাতের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গত কয়েক বছরের ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে ছিল। সেই তুলনায় ২০২৬ সালের ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে এ বছরের ফলাফল শুধু একটি বছরের পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশে পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষার প্রকৃত মান নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।![]()