
রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি পদ শুধু পদ থাকে না; হয়ে ওঠে তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনের এক ধরনের মূল্যায়ন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে এখন তেমনই একটি মুহূর্ত।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন—রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত সম্ভাবনাগুলোর একটি এটি। বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নাম চূড়ান্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থীর সম্মতিসূচক ঘোষণাপত্রে মির্জা ফখরুল স্বাক্ষর করেছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
অন্যদিকে বিরোধী ১১ দলীয় জোট প্রার্থী করেছে কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে। ফলে দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার ভোটাভুটির দিকে যাচ্ছে।
সংসদে বিএনপি ও তার মিত্রদের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাতে মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব খুব জটিল নয়। কিন্তু আসল প্রশ্ন ফলাফল নয়। আসল প্রশ্ন হলো—কেন মির্জা ফখরুল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকাতে হয়।
মির্জা ফখরুল বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ নেতাদের একজন নন। তিনি জনসভায় সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা দেওয়া নেতাও নন। তাঁর রাজনীতির শক্তি অন্য জায়গায়। তিনি কথা বলেন ধীরে, অনেক সময় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, কিন্তু সাধারণত বক্তব্যের মধ্যে একটি যুক্তির কাঠামো রাখার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করলেও ব্যক্তিগত আক্রমণের ভাষা থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই গুণটি খুব সাধারণ নয়।
তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একমত না হওয়া মানুষও অনেক সময় তাঁর ভদ্রতা ও সৌজন্যের কথা বলেন। এই ভাবমূর্তি একদিনে তৈরি হয়নি। ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি এবং বিএনপির সবচেয়ে কঠিন সময়ের নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্র গড়ে উঠেছে।![]()
বিশেষ করে বিএনপি যখন ক্ষমতার বাইরে, তখন মির্জা ফখরুল ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান মুখ। মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন, রাজনৈতিক চাপ সামলেছেন। দলের ভেতরে-বাইরে নানা সংকটের সময়ও তিনি মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সেই অর্থে ‘দুর্দিনের বন্ধু’ কথাটি তাঁর ক্ষেত্রে পুরোপুরি রাজনৈতিক অলংকার নয়।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রশ্নে শুধু এই আনুগত্য বা ত্যাগ যথেষ্ট নয়।
রাষ্ট্রপতি কোনো দলের পুরস্কার পাওয়ার পদ নন। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ফলে একজন দলীয় নেতাকে রাষ্ট্রপতি করার অর্থ হলো তাঁকে দলীয় রাজনীতির সক্রিয় ময়দান থেকে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার জায়গায় নিয়ে যাওয়া।
মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই।![]()
তিনি কি বিএনপির মহাসচিবের পরিচয় পেছনে রেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পরিচয় সামনে আনতে পারবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো শুনলে একটি সম্ভাব্য উত্তর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
চ্যানেল আইয়ের ইউসিবি ‘টু দ্য পয়েন্ট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বর্তমান সরকার, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, কর্মসংস্থান, সাংবিধানিক সংস্কার, নির্বাচন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি প্রায় প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক স্লোগানে না দিয়ে কোনো না কোনো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
এখানেই তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি দিক স্পষ্ট হয়।
তিনি বর্তমান সরকারের কয়েকটি উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, ইমাম-পুরোহিতসহ ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী এবং খেলোয়াড়দের ভাতা দেওয়ার মতো কর্মসূচিকে তিনি জনগণের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখেছেন।
এখানে মির্জা ফখরুলের একটি বাস্তববাদী অবস্থান দেখা যায়। তিনি সরকারে আছেন বলে সরকারের সব কাজকে সফল বলছেন না; আবার নিজের সরকারের সমালোচনাও করছেন না। বরং কোন উদ্যোগ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য আরও বাস্তব।![]()
তিনি বলেছেন, সরকার এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছে, যেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল, লুটপাট ও অনিয়মের কারণে আর্থিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত এবং পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে।
এখানে তাঁর বক্তব্যের গুরুত্ব আছে।
কারণ অর্থনীতি নিয়ে রাজনীতিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাঁরা প্রায়ই খুব দ্রুত ফল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ব্যাংকিং খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ কমানো, পাচার করা অর্থ ফেরত আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসব এক বছরের কাজ নয়।
মির্জা ফখরুল সময়ের কথা বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার একটি প্রক্রিয়া।
এই বাস্তববোধ রাষ্ট্রপতি পদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রপতি অর্থনীতি পরিচালনা করেন না, কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংবিধানিক পরিবেশ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়া উচিত নয়। তাঁর যুক্তি, স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরির জায়গা। সেখানে জাতীয় দলের প্রতীক ঢুকে গেলে স্থানীয় সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন তৈরি হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই যুক্তি অমূলক নয়।![]()
একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নির্বাচন যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো দলীয় সংঘাতে পরিণত হয়, তাহলে স্থানীয় সমাজের সম্পর্কগুলোও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্থানীয় সরকারের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত স্থানীয় মানুষের সমস্যা সমাধান এবং স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি করা।
তবে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য শুধু দলীয় প্রতীক বাদ দিলেই হবে না। টাকা ও ক্ষমতা দুটিই দিতে হবে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়েও তাঁর বক্তব্যে একই ধরনের বাস্তবতা আছে।
তিনি বলেছেন, ঢাকার সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। খাল দখল হয়েছে, ড্রেন বন্ধ হয়েছে, অপরিকল্পিত ভবন হয়েছে, জলাধার কমেছে। নাগরিকদের আচরণও সমস্যার অংশ।
এই সমস্যার সমাধানও তাই একদিনে হবে না।
এখানে একজন রাজনীতিকের পক্ষে ‘আগামী বর্ষায় জলাবদ্ধতা থাকবে না’ বলা সহজ। কিন্তু মির্জা ফখরুল সে ধরনের সহজ প্রতিশ্রুতির পথে যাননি। তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, খাল উদ্ধার এবং নগর পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
তিস্তা প্রকল্প নিয়েও তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার বদলে তথ্যের ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে।
চীনের কাছে তিস্তা প্রকল্প দিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন যে আলোচনা ছিল, তিনি তা নাকচ করে বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে আলোচনা হয়েছে; প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখনো কাউকে দেওয়া হয়নি।
এই অবস্থানটি বাংলাদেশের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বড় প্রকল্পের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যেমন থাকে, তেমনি থাকে কূটনৈতিক হিসাবও।
তবে মির্জা ফখরুলের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত সংবিধান সংস্কার নিয়ে।![]()
তিনি বলেছেন, উচ্চকক্ষ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, একই ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু সব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য না থাকলে সেগুলো নির্বাচিত সরকারকে তার নির্বাচনী ম্যান্ডেট অনুযায়ী করতে হবে—এমন অবস্থানও তিনি তুলে ধরেছেন।
এই বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা প্রকাশ করে।
গণতন্ত্রে সব বিষয়ে ঐকমত্য হবে না। বরং যেখানে ঐকমত্য সম্ভব, সেখানে ঐকমত্য; যেখানে সম্ভব নয়, সেখানে নির্বাচন ও সংসদীয় প্রক্রিয়া—এটাই স্বাভাবিক।
এই জায়গাটিই মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিত্বকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।
কারণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, সংসদ, বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি যদি নিজেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নিজের অবস্থানও সেই ধারণার পরীক্ষার মুখে পড়বে।
গণভোট নিয়ে তাঁর বক্তব্যও একইভাবে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন সামনে আনে। বিএনপি কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। বিশেষ করে উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তাদের আপত্তি ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন।
এখানে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি আলাদা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখছেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রপতির জন্য প্রয়োজনীয়।
কারণ রাষ্ট্রপতির কাজ হলো নিজের দলের মতকে রাষ্ট্রের একমাত্র মত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়।
বরং রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত—সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারা।
এই জায়গায় মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত সৌজন্য তাঁর বড় সম্পদ হতে পারে।![]()
তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়েও তাঁর বক্তব্য বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে। তিনি বলেছেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি যথেষ্ট নয়; দক্ষতা দরকার। তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপর জোর দিতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন আসলে এই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠছে।
আমরা কি শুধু শিক্ষিত তরুণ তৈরি করব, নাকি দক্ষ তরুণও তৈরি করব?
একজন তরুণের হাতে সনদ থাকবে, কিন্তু কাজ থাকবে না—এটি অর্থনীতির জন্য যেমন সমস্যা, সমাজের জন্যও তেমন। আবার একজন তরুণ যদি বৈদ্যুতিক কাজ, যন্ত্রপাতি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা আধুনিক কৃষির মতো কোনো কাজে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তাহলে সে দেশে এবং বিদেশে—দুই জায়গাতেই সুযোগ পাবে।
বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়েও মির্জা ফখরুল তাই দক্ষতার ওপর জোর দিয়েছেন।
এটি শুধু শ্রমবাজারের কথা নয়; এটি রেমিট্যান্সের অর্থনীতির কথাও।
বাংলাদেশ যত বেশি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠাতে পারবে, তত বেশি আয় করার সুযোগ তৈরি হবে।
শিক্ষা নিয়ে তাঁর বক্তব্যও বেশ খোলামেলা। তিনি স্বীকার করেছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সমস্যায় আছে। বিভিন্ন সময়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমছে—এমন উদ্বেগও তিনি জানিয়েছেন।
একজন মন্ত্রী হিসেবে এই স্বীকারোক্তি রাজনৈতিকভাবে খুব আরামদায়ক নয়। কিন্তু বাস্তবতা স্বীকার না করলে সংস্কারও সম্ভব নয়।
এই জায়গায় মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের একটি মানবিক দিক আছে। তিনি শুধু পরীক্ষার ফলের কথা বলেননি; বলেছেন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনার কথা।![]()
রাষ্ট্র আসলে মানুষের জন্য। শিক্ষা ব্যবস্থাও মানুষের জন্য। পরীক্ষার ফল বা পরিসংখ্যানের জন্য নয়।
বয়স্ক নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েও তাঁর বক্তব্য একই ধরনের। প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন ও কল্যাণমূলক উদ্যোগের কথা বলেছেন তিনি।
বাংলাদেশ এখনো তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। কিন্তু আগামী দুই-তিন দশকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়বে। ফলে প্রবীণদের নিরাপত্তা এখন থেকেই রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হওয়া দরকার।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। তবে দীর্ঘদিনের শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়া, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে দলটি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে—এমন মন্তব্য করেছেন তিনি।
এখানেও তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে—ভবিষ্যতে আইনগত পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে বিষয়টি নতুনভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এটি গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা।
কোনো দল আজ নিষিদ্ধ বা অকার্যকর থাকলেই ভবিষ্যতের রাজনীতিও একই থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। গণতন্ত্রের শক্তি হলো, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থান-পতন জনগণের রায়ের মধ্য দিয়ে হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো রাজনৈতিক দলের অতীতের কর্মকাণ্ডের বিচার হবে না। বিচার ও রাজনীতি আলাদা পথে চলতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের বিচার নিয়েও মির্জা ফখরুল বলেছেন, বিএনপি বিচার বিলম্বিত করছে—এমন অভিযোগ অপপ্রচার। তাঁর বক্তব্য, জনগণ বিচার পাবে।
এই কথার বাস্তব পরীক্ষা এখন সামনে।![]()
কারণ বিচার হতে হবে প্রতিশোধের জন্য নয়, ন্যায়বিচারের জন্য। অপরাধী যে দলেরই হোক, বিচার একই মানদণ্ডে হতে হবে। একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখানেই।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়েও মির্জা ফখরুল বলেছেন, বিষয়টি সামরিক আদালতে বিচার হয়েছে এবং এটিকে নতুন করে রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর প্রয়োজন নেই।
এ বক্তব্যের সঙ্গে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর আরও একটি মন্তব্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ—গণমাধ্যম অনেক সময় কোনো কোনো বিষয়কে প্রয়োজনের চেয়ে বড় করে তোলে।
এখানে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে রাজনীতির চিরন্তন টানাপোড়েনটি দেখা যায়।
রাজনীতিকরা চান তাঁদের বক্তব্য সঠিকভাবে প্রকাশিত হোক। সাংবাদিকরা চান ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা হোক। কখনো কখনো এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়।
রাষ্ট্রপতি হলে মির্জা ফখরুলের জন্য এই সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কারণ তিনি আর শুধু সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সমালোচনা করা একজন রাজনৈতিক নেতা থাকবেন না। তিনি হবেন রাষ্ট্রের অন্যতম সাংবিধানিক মুখ।
তখন গণমাধ্যমের সমালোচনা করার চেয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করাই তাঁর বড় দায়িত্ব হবে।
আর এখানেই তাঁর অতীতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। কখনো বিরক্ত হয়েছেন, কখনো তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, আবার বহু সময় ধৈর্য ধরে উত্তরও দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি হলে তাঁকে আরও বেশি ধৈর্য ধরতে হবে।
কারণ রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়।
এই জায়গাটিই তাঁর সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিত্বের আসল সৌন্দর্য হতে পারে।![]()
একজন রাজনীতিক যখন রাষ্ট্রপতি হন, তখন তাঁর সামনে দুটি রাস্তা থাকে। তিনি চাইলে তাঁর দলীয় অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেন। আবার চাইলে সেই অতীতকে সম্মানের সঙ্গে পেছনে রেখে রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিচয় গ্রহণ করতে পারেন।
মির্জা ফখরুল দ্বিতীয় পথটি বেছে নেবেন কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইতিহাস অবশ্য দ্বিতীয় পথের সম্ভাবনা তৈরি করে।
তিনি বিএনপির মহাসচিব হয়েছেন দীর্ঘদিনের সংকটের সময়ে। দলের কঠিন সময়ের মুখপাত্র ছিলেন। রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দল ছাড়েননি। আবার তাঁর রাজনৈতিক ভাষা অনেকের তুলনায় সংযত।
এই গুণগুলো রাষ্ট্রপতির জন্য কাজে আসতে পারে।
তবে দলীয় আনুগত্য আর সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা এক জিনিস নয়।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে যদি কখনো নিজের দলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংবিধানিক দায়িত্বের সংঘাত দেখতে হয়, তখন তাঁর প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পাবে।
ধরা যাক, কোনো বিষয়ে বিএনপি একটি সিদ্ধান্ত নিল, কিন্তু সেটি নিয়ে বিরোধী দল বা অন্য কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের আপত্তি রয়েছে। তখন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল কী করবেন?
তিনি কি বিএনপির সাবেক মহাসচিব হিসেবে ভাববেন?
নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের ইতিহাস লিখবে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের প্রার্থিতা এই পরীক্ষাটিকে আরও অর্থবহ করছে।
অলি আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতির পরিচিত মুখ। দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তিনি জানেন ক্ষমতার রাজনীতি, বিরোধী রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করে।
তিনি জিতবেন না—এই রাজনৈতিক হিসাব খুব পরিষ্কার। কিন্তু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনকে অর্থপূর্ণ করছে।
গণতন্ত্রের জন্য এটি ভালো।
কারণ নির্বাচনে সব সময় জিততে হয় না। কখনো কখনো নির্বাচনে দাঁড়ানোই একটি রাজনৈতিক বক্তব্য।
বিরোধী জোটেরও দায়িত্ব আছে। তারা যেন এই নির্বাচনে শুধু হারার অভিযোগ না তুলে রাষ্ট্রপতি পদ, সংবিধান এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের বক্তব্য জনগণের সামনে তুলে ধরে।![]()
একইভাবে বিএনপিরও দায়িত্ব আছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলেই বিরোধী প্রার্থীকে তুচ্ছ করা যাবে না।
কারণ আজ বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাল অন্য কেউ হতে পারে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিজের জন্য তৈরি করতে হয় না; ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে হয়।
এই জায়গায় মির্জা ফখরুলের নিজের বক্তব্যও মনে রাখা দরকার। তিনি বলেছেন, সরকার ও বিরোধী দলের আদর্শ আলাদা হওয়াই স্বাভাবিক। বিএনপি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে, অন্য দল অন্য আদর্শে বিশ্বাস করবে। এই বহুমতের সহাবস্থানই গণতন্ত্র।
তাঁর কাছে তখন বিএনপির কর্মী যেমন গুরুত্বপূর্ণ হবেন, তেমনি অলি আহমদের ভোটারও গুরুত্বপূর্ণ হবেন। আওয়ামী লীগের একজন সাধারণ ভোটারও তাঁর নাগরিক। জামায়াতের সমর্থকও তাঁর নাগরিক। কোনো দলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন মানুষও তাঁর নাগরিক।
রাষ্ট্রপতির পদে এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
দলীয় রাজনীতিতে আপনি নিজের মানুষ ও প্রতিপক্ষ চিহ্নিত করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদে গিয়ে সেই বিভাজন রাখা যায় না।
মির্জা ফখরুলের সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাষ্ট্রপতি নয়। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রপতি হয়ে তিনি কী ধরনের প্রতিষ্ঠান রেখে যেতে চান।
সময় বলবে তিনি কি রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন?
মির্জা ফখরুলের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিনি বারবার তিনটি বিষয়ের ওপর ফিরে যাচ্ছেন—প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বাস্তবতা।
অর্থনীতি ঠিক করতে সময় লাগবে।
শিক্ষা ঠিক করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা লাগবে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে নগর পরিকল্পনা বদলাতে হবে।
স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে অর্থ ও ক্ষমতা দিতে হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থান দিতে দক্ষতা বাড়াতে হবে।
সংবিধান সংস্কারে ঐকমত্য যেখানে আছে সেখানে এগোতে হবে, যেখানে নেই সেখানে নির্বাচিত সরকারের ম্যান্ডেট প্রয়োজন।
রাজনীতিতে বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু তারও যুক্তি থাকতে হবে।
এই বক্তব্যগুলো আলাদা আলাদা মনে হলেও আসলে একটি ধারণার সঙ্গে যুক্ত—রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক করতে হবে।
সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের সবচেয়ে বড় সম্পদও সম্ভবত এটাই।
তিনি কোনো তরুণ, হঠাৎ উঠে আসা রাজনৈতিক নেতা নন। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে।![]()
রাষ্ট্রপতির জন্য অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে অভিজ্ঞতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মসংযম।
কারণ রাষ্ট্রপতি পদে অনেক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে নেওয়া হয় না। অনেক সময় ভূমিকা থাকে পরামর্শ দেওয়া, সংবিধানের সীমার মধ্যে থাকা, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সংকটের সময় একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করা।
এখানে মির্জা ফখরুলের সংযত রাজনৈতিক স্বভাব তাঁর জন্য বড় সুবিধা হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া যদি নিশ্চিতও হয়, ইতিহাসের প্রশ্ন সেখানেই শেষ হবে না; বরং সেখান থেকেই শুরু হবে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন হবে তাঁর অতীত দিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের মূল্যায়ন হবে তাঁর ভবিষ্যৎ আচরণ দিয়ে।
তিনি কি দলের বাইরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে দেখতে পারবেন?
তিনি কি বিরোধী মতকে নিরাপদ রাখতে পারবেন?
তিনি কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে থাকবেন?
তিনি কি গণমাধ্যমের কঠিন প্রশ্ন সহ্য করতে পারবেন?
তিনি কি ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও সাংবিধানিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—মির্জা ফখরুল যদি সত্যিই রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ পুরস্কার হবে না; বরং সবচেয়ে কঠিন দায়িত্বের শুরু হবে।
দুর্দিনে তিনি দলের পাশে ছিলেন—এটি তাঁর রাজনৈতিক ইতিহাস।
সুদিনে তিনি রাষ্ট্রের পাশে কতটা দাঁড়াতে পারেন—সেটিই হবে তাঁর উত্তরাধিকার।
আর হয়তো এখানেই মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্থ।
তিনি যদি বঙ্গভবনে যান, তাঁকে সঙ্গে করে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসও সেখানে যাবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর কাজ হবে সেই ইতিহাসকে সম্মান করেও তার ঊর্ধ্বে ওঠা।
কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পরিচয় কোনো দলের চেয়ে বড়।
আর একজন রাজনীতিকের জীবনে এর চেয়ে বড় পরীক্ষাও হয়তো আর নেই।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব![]()