আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতির অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে আরও হাজার হাজার মানুষের ভ্রমণ ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা বাতিল করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সোমবার প্রকাশিত এক তথ্যবিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন, জালিয়াতি, সহিংসতায় উসকানি এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি—এসব কারণে ভিসা বাতিল করা হয়েছে। নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ভিসাধারীরা যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও ভিসার শর্ত মেনে চলছেন কি না, পাশাপাশি তাঁরা দেশটির নাগরিকদের জন্য কোনো ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছেন কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ভিসা বাতিলের কারণ হিসেবে হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের কথাও উল্লেখ করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। গুরুতর কয়েকটি মামলার উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, একজনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও মানব পাচারের অভিযোগ এবং আরেকজনের বিরুদ্ধে শিশু যৌন নিপীড়নের উপকরণ রাখার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হয়েছে। অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের পাশাপাশি বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী বিদেশিদের ক্ষেত্রেও যাচাই-বাছাই বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে বৈধ ভিসাধারীদের একটি অংশও প্রশাসনের নতুন কঠোর নীতির আওতায় পড়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকার একটি মার্কিন দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করতে চাওয়া বাবা-মায়ের ১০০টির বেশি ভিসা বাতিল করেছে। এসব ব্যক্তিকে ‘বার্থ ট্যুরিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে সেই সন্তানের মাধ্যমে দেশটির নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই তাঁদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল।
এ ছাড়া চার্লি কার্ক হত্যার ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের ভিসাও বাতিল করা হয়েছে। তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্যকে ভিসা বাতিলের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করার কাজ অব্যাহত থাকবে। তাঁদের কর্মকাণ্ডও তদন্ত করা হবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা কোনো অধিকার নয়, এটি একটি সুযোগ। কেউ ভিসার অপব্যবহার করলে তা বাতিল করার জন্য বিদ্যমান সব ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। সে সময় এই সংখ্যাকে রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
শুধু ভিসা বাতিল নয়, নতুন করে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কঠোরতা বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার পাশাপাশি নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরিধি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ, পড়াশোনা, কাজ কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে আবেদন করা বিদেশি নাগরিকদের জন্য প্রক্রিয়াটি আগের তুলনায় আরও কঠোর হয়ে উঠেছে।
তবে প্রশাসনের এই নীতির সমালোচনা করছেন অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের কর্মকাণ্ডের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের নামে অভিবাসীদের নির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করাই এই কঠোরতার মূল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া পদক্ষেপগুলো যেন ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম না করে।
ভিসা বাতিলের সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা তাই শুধু অভিবাসননীতির কঠোরতারই প্রতিফলন নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও ভিসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।