
দেশে নীরবে এমন একটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পথে রয়েছে, যা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করার মতো। অথচ বিষয়টি নিয়ে এখনো তেমন আলোচনা, জনপরিসরে বিতর্ক কিংবা প্রতিবাদ চোখে পড়ছে না।
শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে এটি শুধু নিয়োগব্যবস্থার একটি পরিবর্তন হবে না; বরং দেশের বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কেন আবার স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে?
শিক্ষক একটি প্রতিষ্ঠানের শুধু একজন কর্মচারী নন। একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ, জ্ঞান ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা, মেধা, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সেই জায়গায় যদি নিয়োগের ক্ষমতা এমন একটি কাঠামোর হাতে চলে যায়, যেখানে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
কয়েক দিন আগেই দেশের ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। এসব ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, কারা নিয়োগ দিয়েছেন, কারা যাচাই না করে নিয়োগ দিয়েছেন এবং কীভাবে একজন অযোগ্য ব্যক্তি শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি সামনে আসেনি।
কিন্তু এসব ঘটনার একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে যদি পর্যাপ্ত যাচাই, কেন্দ্রীয় নজরদারি ও জবাবদিহি না থাকে, তাহলে নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এখন সেই নিয়োগের দায়িত্বই যদি আবার ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়া হয়, তাহলে ঝুঁকিটা আরও বড় হবে না—এই নিশ্চয়তা কোথায়?
আমাদের দেশের বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডিতে স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয়। কোথাও তাঁরা সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, কোথাও তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নিয়োগের ক্ষমতা তাঁদের হাতে গেলে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সুপারিশ, অর্থনৈতিক লেনদেন কিংবা স্বজনপ্রীতির প্রভাব পড়বে না—এমন নিশ্চয়তা কীভাবে দেওয়া হবে?
বরং আশঙ্কা হচ্ছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ, ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ কিংবা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগকে তখন বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়ার আড়ালে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখানে আরও একটি বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদ ও অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ ছয় মাস নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল—এই সময়ের মধ্যে নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি নির্বাচন করে দায়িত্ব হস্তান্তর করা।
কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কোথাও আগের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই নতুন কাঠামোয় থেকে গেছেন, কোথাও আবার রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত্তিতে পরিচালনা পর্ষদ গঠনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে যে কাঠামোর স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, সেই কাঠামোর হাতে শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা তুলে দেওয়ার আগে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে।
জানা গেছে, এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব ৩ আগস্ট সামনে আসে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত পরিবর্তন মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কীভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাল—সেটিই এখন পরিষ্কার হওয়া দরকার।
শিক্ষক নিয়োগের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষাবিদদের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না, শিক্ষা প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না, শিক্ষক সংগঠন, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানা প্রয়োজন।
কারণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সিদ্ধান্ত শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজের ওপর।
কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে সেটি সংস্কার করা যেতে পারে। নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর করা যায়। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রাখা যায়। কিন্তু সমাধানের নামে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে নিয়োগদাতার ওপর স্থানীয় রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বেড়ে যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি?
যদি একজন শিক্ষক রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ পান, তার ক্ষতি শুধু একজন যোগ্য প্রার্থীর চাকরি না পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শ্রেণিকক্ষে একজন অযোগ্য শিক্ষক প্রবেশ করলে তার প্রভাব পড়ে শত শত শিক্ষার্থীর ওপর। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা, চিন্তাশক্তি, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের ওপর সেই প্রভাব বহু বছর ধরে থেকে যেতে পারে।
আর এ কারণেই শিক্ষক নিয়োগকে অন্য যেকোনো প্রশাসনিক নিয়োগের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
সরকারের উচিত সিদ্ধান্তটি দ্রুত পুনর্বিবেচনা করা। অন্তত ব্যাপক পরামর্শ, গবেষণা ও অংশীজনের মতামত নিয়ে তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া। প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে বর্তমান শিক্ষক নিয়োগব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা কী হবে, তারা কীভাবে জবাবদিহির আওতায় থাকবে এবং নিয়োগে রাজনৈতিক বা আর্থিক প্রভাব ঠেকাতে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা কোনো রাজনৈতিক পরীক্ষাগার নয়। এখানে একটি ভুল সিদ্ধান্তের ফল একদিনে দেখা যায় না; তার প্রভাব পড়ে একটি পুরো প্রজন্মের ওপর।
তাই এখনই সতর্ক হওয়া দরকার।
সরকারের প্রতি অনুরোধ—এ সিদ্ধান্তকে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয় হিসেবে দেখবেন না। এটিকে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখুন। প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসুন, অথবা ব্যাপক পর্যালোচনা ও সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করে তারপর বাস্তবায়নের পথে এগোন।
আর নাগরিক সমাজ, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষকদের নিয়োগ কীভাবে হবে, কার হাতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় কতটা স্বচ্ছতা থাকবে—এ প্রশ্নগুলো নিয়ে এখনই জনপরিসরে আলোচনা হওয়া দরকার।
কারণ শিক্ষা ধ্বংস হওয়ার পর তা পুনর্গঠন করা যায়, কিন্তু একটি প্রজন্মের হারানো সময় ফিরিয়ে আনা যায় না।
এই সিদ্ধান্তটি ভুল হলে সরকারকে তা বুঝতে হবে দ্রুত। আর জনগণের দায়িত্ব হলো, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তোলা এবং যুক্তিসংগত জনমত তৈরি করা—যাতে শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নতুন সংকটের কারণ না হয়।![]()