ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়তে করনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও দক্ষ মানবসম্পদে জোর
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল কর কাঠামো, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতারা। একই সঙ্গে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের তাগিদ এসেছে।
রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় গতকাল আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রা: উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও আইসিটি-নির্ভর প্রবৃদ্ধির নীতিগত অগ্রাধিকার’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্যে অ্যামচেমের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন অনুমোদন করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আইনটি প্রণয়নের শুরু থেকেই অ্যামচেম এতে সম্পৃক্ত ছিল এবং চূড়ান্ত আইনে তাদের অধিকাংশ সুপারিশ প্রতিফলিত হয়েছে।
অর্থ আইন ২০২৬-এর আওতায় ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর অব্যাহতি এবং কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর শুল্ক সুবিধাকেও স্বাগত জানান তিনি। একই সঙ্গে এক লাখ গ্রাহকসীমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন ডিজিটাল স্থাপনা বিধানের বিষয়ে স্পষ্টতা এবং ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মোট প্রাপ্তির ওপর টার্নওভার কর ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপগুলোর জন্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করারও দাবি জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেহান আসিফ আসাদ আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করে পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। এর প্রথমটি হলো পাঁচ বছর মেয়াদি কর কাঠামোর আওতায় ধারাবাহিক ও ভবিষ্যৎমুখী নীতি প্রণয়ন।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক গড় ২২ দশমিক ২৭ শতাংশের তুলনায় বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে কার্যকর করের বোঝা ৫১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি করনীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সিম কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সংযোগের মান ও সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন উপদেষ্টা। তার ভাষ্য, গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে থাকলেও সেবার মানের ক্ষেত্রে দেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি ‘এক নাগরিক, এক পরিচয়, এক ডিজিটাল ওয়ালেট’ উদ্যোগের আওতায় শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান। এ ক্ষেত্রে এস্তোনিয়ার এক্স-রোড প্লাটফর্ম অনুসরণ করা হবে এবং এটি বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। প্রত্যেক নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয়কে ব্যাংক হিসাব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
চতুর্থ অগ্রাধিকার এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৩ থেকে ৩০ হাজার প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বের হন। তাদের এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা বিষয়ে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যক্রমেও এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
পঞ্চম অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণের কথা বলেন। এ খাতে পোশাক শিল্পের মতো প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ভিয়েতনামের উদাহরণ দেন তিনি। তার তথ্য অনুযায়ী, এক দশকে ভিয়েতনামের কনজিউমার ইলেকট্রনিকস রফতানি ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২১৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
ব্রডব্যান্ড বিস্তারের অর্থনৈতিক প্রভাবও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্রডব্যান্ডের বিস্তার ১০ শতাংশ বাড়লে জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।
অ্যামচেমের তথ্যপ্রযুক্তি উপকমিটির চেয়ার ও ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলার সঞ্চালনায় সংলাপে চারটি বিষয়ে আলোচনা হয়। এগুলো হলো প্রতিযোগিতামূলক ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা, বিশ্বস্ত ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, এআই, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং সরকার ও শিল্প খাতের অংশীদারত্ব জোরদার করা।
আলোচনায় অ্যামচেমের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা মেট্রোরেল ও টোল ব্যবস্থায় উন্মুক্ত পদ্ধতির টিকিটিং চালু, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য বাংলা কিউআর উন্মুক্ত করা এবং ‘এক নাগরিক, এক ওয়ালেট’ উদ্যোগ চালুর দাবি জানান। পাশাপাশি স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সের আওতায় কর সুবিধা পুনর্বিবেচনা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্লাউড নীতি এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে তথ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়।
ডিজিটাল স্বাক্ষর ও আইনগতভাবে কার্যকর ইলেকট্রনিক চুক্তির ব্যবস্থা, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এআই ও ডেটা প্রকৌশলে দক্ষতার ঘাটতি পূরণের ওপরও গুরুত্ব দেন অংশগ্রহণকারীরা।
এসব বিষয়ে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আরএফআইডি-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় টোল আদায় ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহের জন্য বাংলা কিউআর উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। ‘এক নাগরিক, এক পরিচয়’ প্লাটফর্ম দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পেমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য উন্মুক্ত থাকবে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় সাইবার নিরাপত্তাকে নিজের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি যৌথ দলের মাধ্যমে জাতীয় এআই নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।
ডিজিটাল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াতে সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা ৬ টেরাবাইটের বিপরীতে সর্বোচ্চ জাতীয় চাহিদা ১২ টেরাবাইটে পৌঁছেছে। প্রতি দুই বছরে ডেটা ট্রাফিক দ্বিগুণ হচ্ছে।
নতুন সাবমেরিন কেবল স্থাপনে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অ্যামচেমের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমেদ। সভায় অ্যামচেমের নির্বাহী কমিটির সদস্য, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন সদস্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তারা অংশ নেন।![]()