বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, শিল্পের পরিধি বাড়ছে, নগরায়ণ দ্রুত হচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসছে। এর প্রতিটি ধাপের সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানির চাহিদা। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শিল্পকারখানা, পরিবহন থেকে কৃষি, নির্মাণ থেকে বাণিজ্য—অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি চাকা কোনো না কোনোভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি এখন কেবল একটি পণ্য নয়; এটি অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
কিন্তু অর্থনীতির যে গতিতে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে, সে গতিতে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। আমদানি, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের পুরো ব্যবস্থায় এখনো পুরোনো কাঠামোর প্রভাব প্রবল। একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সীমিত পরিশোধন সক্ষমতা, পর্যাপ্ত মজুত অবকাঠামোর ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা—সব মিলিয়ে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা অর্থনীতির জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সময় এসেছে। রাষ্ট্রকে প্রতিটি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সরাসরি মালিক ও পরিচালনাকারী হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত নীতি নির্ধারণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। আর যেখানে বিপুল বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন, সেখানে বেসরকারি খাতকে আরও বড় পরিসরে যুক্ত করা দরকার।
এটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমানোর কোনো প্রস্তাব নয়। বরং এটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে আরও কার্যকর করার প্রস্তাব। কারণ ব্যবসা পরিচালনা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দায়িত্ব। রাষ্ট্র যখন একই সঙ্গে মালিক, ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে, তখন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নেয় এবং বাজারে একাধিক সক্ষম প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেয়, তাহলে জবাবদিহি ও দক্ষতা—দুটিই বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি তেল খাতের বর্তমান কাঠামো এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। দীর্ঘদিন ধরে আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের বড় অংশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। দেশের অর্থনীতি যখন তুলনামূলক ছোট ছিল, তখন এ ধরনের কাঠামো হয়তো কোনোভাবে কার্যকর রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখন বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে, যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়েছে, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে এবং দেশের ভোগব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়েছে। অর্থাৎ জ্বালানির চাহিদা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি এবং এর ধরনও বহুমাত্রিক। ফলে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে পুরো জ্বালানি অর্থনীতি পরিচালনা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা যায় পরিশোধন সক্ষমতায়। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় স্থানীয়ভাবে পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা সীমিত। ফলে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত বা পরিশোধিত জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব সরাসরি দেশের আমদানি ব্যয় ও বাজারে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ তৈরি হলেও জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন কমানো যায় না। কারণ জ্বালানি ছাড়া শিল্পের উৎপাদন, পরিবহন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু আমদানি নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি উৎপাদন, পরিশোধন, মজুত ও সরবরাহের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়ও।
এখানেই বেসরকারি বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে।
দেশি কিংবা বিদেশি কোনো সক্ষম প্রতিষ্ঠান যদি নিজস্ব অর্থায়নে আধুনিক রিফাইনারি স্থাপন করতে চায়, তাহলে তাকে দীর্ঘসূত্রতা ছাড়া স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সুযোগ দেওয়া উচিত। একইভাবে আধুনিক সংরক্ষণাগার, পাইপলাইন, জ্বালানি টার্মিনাল, পরিবহনব্যবস্থা ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণেও বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো দরকার।
একটি বড় রিফাইনারি স্থাপন শুধু একটি শিল্পপ্রকল্প নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বন্দর, জাহাজ, পাইপলাইন, সংরক্ষণাগার, পরিবহন, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষ জনশক্তির বিশাল একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ফলে এ ধরনের বিনিয়োগ জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পায়নের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এই সম্ভাবনাটিকে বিনিয়োগনীতির অংশ হিসেবে দেখা।
বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানি খাতে রাষ্ট্র ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি কাজ করছে। কোথাও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কৌশলগত অবকাঠামো ধরে রেখেছে, আবার কোথাও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব।
বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় বাজার হতে পারে। কিন্তু শুধু বাজার বড় হলেই বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারী দেখেন নীতি কতটা স্থিতিশীল, অনুমোদন পেতে কত সময় লাগে, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ আছে কি না, আইন কতটা পূর্বানুমানযোগ্য এবং সরকারি সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ।
তাই জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আনতে হলে প্রথমে বিনিয়োগের পরিবেশকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে।
লাইসেন্স পেতে যদি বছরের পর বছর সময় লাগে, একটি প্রকল্প অনুমোদনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দরজায় ঘুরতে হয় কিংবা নীতিমালা ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়, তাহলে কোনো বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। একইভাবে একজন স্থানীয় উদ্যোক্তাও বড় প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।
এখানে এক জানালা সেবা কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভূমি, আমদানি, অবকাঠামো, কর ও অন্যান্য অনুমোদনকে যতটা সম্ভব সমন্বিত করতে হবে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। বিনিয়োগকারী যেন আগে থেকেই জানতে পারেন কোন প্রক্রিয়ায় কত সময় লাগবে এবং কোন শর্ত পূরণ করতে হবে।
তবে বেসরকারি বিনিয়োগের দরজা খুলে দিলেই কাজ শেষ হবে না। বরং তখন সরকারের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাজারে একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকবে—এটাই প্রতিযোগিতার ভিত্তি। কিন্তু একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলেই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয় না। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান যদি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, নতুন প্রতিষ্ঠান প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে বা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তাহলে বেসরকারিকরণ কিংবা উদারীকরণ কোনো সুফল দেবে না।
তাই জ্বালানি খাতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন। মূল্য, পণ্যের মান, আমদানি ব্যয়, মজুত, পরিবহন খরচ, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং বাজার প্রতিযোগিতা—প্রতিটি জায়গায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ না পায়, আবার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে বৈধ ব্যবসাও যেন বাধাগ্রস্ত না হয়—এই ভারসাম্য নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
সহজ ভাষায় বলা যায়, সরকারকে ব্যবসায়ী হওয়ার চেয়ে রেফারির ভূমিকায় বেশি দক্ষ হতে হবে। মাঠে খেলোয়াড় যত বেশি থাকবে, প্রতিযোগিতা তত বাড়বে। কিন্তু রেফারি যদি নিরপেক্ষ না হন, নিয়ম যদি সবার জন্য সমান না হয়, তাহলে পুরো খেলাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর আরেকটি বড় সুবিধা হলো সরবরাহের ঝুঁকি কমানো। বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, আমদানির উৎস কিংবা অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে সেখানে সমস্যা তৈরি হলে তার অভিঘাত পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু একাধিক আমদানিকারক, রিফাইনারি, সংরক্ষণকারী ও সরবরাহকারী থাকলে ঝুঁকি ভাগ হয়ে যায়।
একটি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ কমলে অন্য প্রতিষ্ঠান বাজারে ঘাটতি পূরণ করতে পারে। একটি রিফাইনারিতে সমস্যা হলে অন্য রিফাইনারি উৎপাদন বাড়াতে পারে। একটি আমদানির উৎসে সমস্যা হলে অন্য উৎস থেকে জ্বালানি আনা সম্ভব হয়। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা শুধু বাজারের দক্ষতা বাড়ায় না, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকেও শক্তিশালী করে।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অবশ্যই থাকবে। সরকারি রিফাইনারি, বিপণন প্রতিষ্ঠান কিংবা কৌশলগত মজুত অবকাঠামো হঠাৎ করে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এগুলোকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে রেখে তাদের পাশাপাশি বেসরকারি সক্ষমতা বাড়ানোই হবে বাস্তবসম্মত পথ।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দক্ষতা বাড়াতে হবে। ক্রয়ব্যয় কমাতে হবে, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, প্রযুক্তি আধুনিক করতে হবে এবং গ্রাহকসেবার মান বাড়াতে হবে। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বুঝতে হবে যে জ্বালানি সাধারণ কোনো ভোগ্যপণ্য নয়; এর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।
এ কারণে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু বিশেষ শর্তও থাকতে পারে। নির্দিষ্ট পরিমাণ কৌশলগত মজুত রাখা, জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ নিশ্চিত করা, মান বজায় রাখা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্য সরকারের কাছে নিয়মিত দেওয়া—এসব বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়ন।
একটি বড় রিফাইনারি, গভীর সমুদ্রবন্দরভিত্তিক জ্বালানি টার্মিনাল কিংবা বড় সংরক্ষণাগার নির্মাণে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। সব প্রকল্পের অর্থ সরকার একা বহন করবে—এমন মডেল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়লে অন্য সামাজিক ও অবকাঠামো খাতের বরাদ্দও সংকুচিত হতে পারে।
বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ যুক্ত হলে সরকারের আর্থিক চাপ কমবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার গতি, প্রযুক্তি ও দক্ষতা কাজে লাগানো যাবে। অবশ্য এ ধরনের অংশীদারিতে চুক্তির শর্ত অত্যন্ত স্বচ্ছ হতে হবে। অতীতে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে যে ধরনের অস্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ের অভিযোগ উঠেছে, জ্বালানি খাতে তা পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।
বেসরকারি বিনিয়োগের অর্থ শুধু বিদেশি কোম্পানি নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্পগোষ্ঠী, ব্যাংক, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদেরও এই খাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তবে সক্ষমতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। কেবল রাজনৈতিক যোগাযোগ বা বিশেষ সুবিধার ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি খাতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হলে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে নতুন ধরনের একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।
তাই বিনিয়োগকারী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আর্থিক সামর্থ্য, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তা মান এবং পরিচালন দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়বে। একটি রিফাইনারি বা বড় টার্মিনাল নির্মাণে প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, পরিবহনকর্মী, রক্ষণাবেক্ষণকর্মীসহ বিভিন্ন ধরনের দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় সরবরাহকারী ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন ব্যবসার সুযোগ পায়।
অর্থাৎ জ্বালানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগের বহুগুণ অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। কোনো শিল্পকারখানা যদি জ্বালানির অনিশ্চয়তায় উৎপাদন পরিকল্পনা করতে না পারে, তাহলে বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যায়। উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে এবং শেষ পর্যন্ত এর বোঝা ভোক্তার ওপর পড়ে।
তাই জ্বালানি খাতকে শুধু একটি সরকারি সেবা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। মজুতের তথ্য, সরবরাহের প্রবাহ, পরিবহন, চাহিদা পূর্বাভাস ও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। ডিজিটাল নজরদারি থাকলে কোথায় কত মজুত আছে, কোন অঞ্চলে চাহিদা বাড়ছে এবং কোথায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে—তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ তাই শুধু নতুন রিফাইনারি নির্মাণে নয়; দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করবে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—নীতির ধারাবাহিকতা। জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের মেয়াদ সাধারণত দীর্ঘ। একজন বিনিয়োগকারী আজ অর্থ বিনিয়োগ করে আগামীকাল লাভ করবেন না। একটি রিফাইনারি বা টার্মিনাল থেকে বিনিয়োগ ফেরত পেতে বহু বছর সময় লাগতে পারে। ফলে সরকার পরিবর্তন হলে বা নীতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগের কাঠামো বদলে গেলে এ খাতে বড় বিনিয়োগ আসবে না।
বাংলাদেশকে তাই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির দিকে যেতে হবে। কোন খাতে রাষ্ট্র থাকবে, কোথায় বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে, কীভাবে মূল্য নির্ধারণ হবে, কীভাবে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ কীভাবে বজায় থাকবে—এসব বিষয়ে একটি স্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো প্রয়োজন।
অবশ্য বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে জনস্বার্থকে কখনোই দ্বিতীয় স্থানে রাখা যাবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করবে, সেটিই ব্যবসার স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সেই লাভের সঙ্গে ভোক্তার অধিকার, ন্যায্য মূল্য, পণ্যের মান ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থও নিশ্চিত করতে হবে।
এই জায়গায় শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তথ্য বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। নিয়ন্ত্রণ যদি দুর্বল হয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগের সুফলের পরিবর্তে বাজারে কারসাজি, অতিরিক্ত মুনাফা কিংবা সরবরাহের অনিয়ম তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ যদি অতি কঠোর হয়, তাহলে বৈধ বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হবে। তাই লক্ষ্য হতে হবে ‘নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা’, ‘নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যবসা বন্ধ করা’ নয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন মূল সিদ্ধান্তটি তাই বেশ পরিষ্কার। রাষ্ট্র কি জ্বালানি খাতের প্রতিটি স্তরে নিজেই বিনিয়োগ করবে এবং পরিচালনা করবে, নাকি রাষ্ট্র তার মূল শক্তিকে নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নিরাপত্তায় কেন্দ্রীভূত করে বেসরকারি খাতের অর্থ, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাকে কাজে লাগাবে?
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিতীয় পথটি বেশি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
তবে এর অর্থ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেওয়া নয়। বরং তাদের দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা। একই সঙ্গে সক্ষম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি কাজ করবে, কিন্তু নিয়ম সবার জন্য সমান থাকবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখন শুধু কত জ্বালানি আমদানি করা হলো, সেই হিসাব দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে দেশের নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা কতটা বাড়ল, কত দিনের মজুত রয়েছে, সরবরাহের উৎস কতটা বহুমুখী, অবকাঠামো কতটা আধুনিক এবং বাজার কতটা প্রতিযোগিতামূলক।
অর্থনীতির পরিধি যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে পুরোনো কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আর সে জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের শক্তিশালী নীতিনির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও দক্ষতার সমন্বয়।
রাষ্ট্রের হাতে থাকবে নীতি ও নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি। বেসরকারি খাত আনবে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পরিচালন দক্ষতা। বাজারে থাকবে প্রতিযোগিতা, আর সরকারের দায়িত্ব থাকবে নিশ্চিত করা—কেউ যেন সেই প্রতিযোগিতাকে নিজের স্বার্থে বিকৃত করতে না পারে।
এই ভারসাম্যই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ভিত্তি। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু আজকের চাহিদা পূরণ করা নয়; আগামী দিনের শিল্প, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করা।