গ্যাস-সংকট পুরোপুরি কাটেনি। তবে সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর গ্যাসনির্ভর অনেক শিল্পকারখানা আবার উৎপাদনে ফিরতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গতকাল রোববার কারখানাগুলো চালু হতে দেখা গেছে। যদিও গ্যাসের চাপ এখনো সব জায়গায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে বিদ্যুতের লোডশেডিং পরিস্থিতিরও তেমন উন্নতি হয়নি। ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ বাড়ায় পরিস্থিতি গত কয়েক দিনের তুলনায় কিছুটা ভালো হয়েছে। তবে যেসব কারখানায় তুলনামূলক বেশি চাপের গ্যাস প্রয়োজন, সেগুলো এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন কমিয়ে চালানো হচ্ছে, আবার কোথাও সন্ধ্যার পর চাপ বাড়লে উৎপাদন শুরু করা হচ্ছে।
দেশের শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় নিত্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাতসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন কমে যায়। গত সপ্তাহে সংকট তীব্র হলে অনেক কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়।
তবে গত শনিবার সামিট গ্রুপের এলএনজি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। শনিবার ভোর চারটা থেকে সরবরাহ বৃদ্ধির ধারা দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ ৩০০ কোটি ঘনফুটে উঠলে মোটামুটি সব খাতে সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব। তবে স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে বিভিন্ন খাতে রেশনিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।
শুক্রবার বিকেলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছিল ১৭৩ কোটি ঘনফুটে। পরদিন সন্ধ্যায় তা বেড়ে ২৪৪ কোটি ঘনফুটে ওঠে। গতকাল সরবরাহ ছিল ২২৯ কোটি ঘনফুট। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে ঘাটতি আরও কমে আসবে।
নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে চিনি, গম, ভোজ্যতেল, ডালসহ নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতের শতাধিক কারখানা রয়েছে। গত বুধবার গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ার পর এসব কারখানার অনেকগুলোতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। শনিবার পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক কারখানা বন্ধ ছিল। গতকাল সকাল থেকে গ্যাসের চাপ বাড়ায় সেগুলো ধীরে ধীরে উৎপাদনে ফিরতে শুরু করে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সয়াবিনবীজ মাড়াই, তেল উৎপাদন, আটা-ময়দা ও অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতের কারখানাগুলোর বেশির ভাগই গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গ্রুপটির ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টির উৎপাদন শনিবার বিকেল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। গতকাল গ্যাসের চাপ বাড়ায় এসব কারখানায় ধীরে ধীরে উৎপাদন শুরু হয়েছে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
টি কে গ্রুপের ২৮টি কারখানার বেশির ভাগের উৎপাদনও গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গতকাল সেগুলো আবার চালু হয়েছে। তবে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে কিছু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
টি কে গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ঢাকার আশপাশের বেশির ভাগ কারখানা চালু হয়েছে এবং পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন হচ্ছে। তবে যেসব কারখানায় বেশি গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, সেগুলো প্রায় ৬৫ শতাংশ সক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে। ঢাকার বাইরের শিল্পাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কারখানাগুলোর উৎপাদনও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। গ্রুপটির পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, হবিগঞ্জের শিল্পপার্কে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। নরসিংদীতে চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং গাজীপুরে ৬০ শতাংশ গ্যাস পাওয়া গেলেও বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুরের মাওনা এলাকায় আর্টিসান সিরামিকসের কারখানায় গ্যাস-সংকটে গত এক সপ্তাহে তৈজসপত্রের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২২ হাজারটি। গতকাল উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৮ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য নষ্ট হয়েছে।
আর্টিসান সিরামিকসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মামুনূর রশীদ বলেন, সন্ধ্যার পর গ্যাসের চাপ বাড়লে তখন উৎপাদন করা হচ্ছে। গতকাল বিকেল পাঁচটার পর চাপ কিছুটা বেড়ে ৫ পিএসআই হয়েছে। তবে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন ৮ থেকে ৯ পিএসআই।
গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার সকালেও অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ ছিল খুবই কম। কোথাও কোথাও চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। গতকাল সকালে কয়েকটি এলাকায় চাপ বাড়তে শুরু করে। কোথাও আবার বিকেলের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কোনো কোনো কারখানায় গ্যাসের চাপ ৭ থেকে ১০ পিএসআই পর্যন্ত উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জের এক পোশাকশিল্প উদ্যোক্তা জানান, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ বেড়েছে। গতকাল সন্ধ্যার পর চাপ ৪ থেকে ৫ পিএসআই ছিল, যা দিয়ে ডাইং কারখানা চালানো সম্ভব।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। আজ সোমবার পরিস্থিতি আরও উন্নত হওয়ার আশা রয়েছে। তবে ঢাকার বাইরে বিদ্যুতের লোডশেডিং এখনো বড় সমস্যা। অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি সংকট পুরোপুরি সমাধানে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা ছয় মাস বা এক বছরে সমাধান হবে না। এতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই সরকার দ্রুত সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিচ্ছে। দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধান না হলেও এখন তা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লা নিয়ে কাজ চলছে। কোন ধরনের জ্বালানি কতটা প্রয়োজন, সেটিও নির্ধারণ করা হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানিনীতি প্রকাশ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করতেও দেড় থেকে দুই বছর সময় প্রয়োজন। ফলে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর আগে জ্বালানি সংকট পুরোপুরি দূর করা কঠিন।
শিল্প খাতে সাম্প্রতিক গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বস্তি আনলেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি এখনো উৎপাদনের বড় বাধা হয়ে আছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিং এবং কম গ্যাসের চাপের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে সাময়িকভাবে কারখানা চালু হলেও শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।