বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে ৪২ বছর আগের বেসামরিক বিমান চলাচল বিধিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ সহজ করা, আন্তর্জাতিক মানের বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র (এমআরও) স্থাপন এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে এভিয়েশন খাতকে অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।
রাজধানীর কুর্মিটোলায় অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ১৯৮৪ সালের সিভিল এভিয়েশন রুলস সংশোধন করে নতুন ‘রুলস ২০২৬’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। নতুন বিধিমালায় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, বেসরকারি বিনিয়োগ, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের বিমানবন্দরগুলো শুধু যাত্রী পরিবহনের অবকাঠামো নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার। এ কারণেই একটি সমন্বিত এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বিমানবন্দর, কার্গো, রক্ষণাবেক্ষণ ও বেসরকারি অংশীদারত্বকে নতুনভাবে সাজানো হবে। তিনি দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসকে বিধিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
কনক্লেভে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বাজারের সম্ভাব্য আকার প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রুট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি বাংলাদেশের জন্য আগের তুলনায় বেশি রাজস্ব নিশ্চিত করবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হবে। তবে এ সক্ষমতার সুফল পেতে বিমানবন্দরের অপারেশনাল প্রস্তুতি, যাত্রী স্থানান্তর ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবাও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত বিশ্লেষণে উঠে আসে, বর্তমানে দেশের জিডিপিতে এভিয়েশন খাতের অবদান তুলনামূলক কম হলেও পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে এ খাত থেকে বছরে ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন সম্ভব। পাশাপাশি দেশীয় চারটি এয়ারলাইনস আগামী কয়েক বছরে বহরে প্রায় ৪০টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে একটিমাত্র রানওয়ে থাকার কারণে ট্যাক্সিওয়েতে দীর্ঘ অপেক্ষায় প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। এছাড়া উচ্চ কর ও ভ্যাট, জ্বালানির দাম, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যয় এবং লাইসেন্স জটিলতা দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
তিনি নতুন বিধিমালাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ইঞ্জিন মেরামতের নিয়ম সহজ হলে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর বছরে কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের এমআরও সুবিধা চালু হলে বাংলাদেশ নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে এবং বিদেশে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ দেশেই রাখা সম্ভব হবে।
কনক্লেভে বক্তারা অভিন্নভাবে মত দেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও আধুনিক বিধিমালার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এভিয়েশন খাত শুধু যোগাযোগ নয়, রপ্তানি, পর্যটন, বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হবে।