চলমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সংস্কারের ধারাবাহিকতা, ব্যবসায়িক পরিবেশের পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু মৌলিক সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ আয়োজিত ‘বিল্ডিং ইনভেস্টরস কনফিডেন্স: ফ্রম পলিসি রিফর্ম টু ইফেক্টিভ ইমপ্লিমেন্টেশন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা যেসব মৌলিক বিষয় বিবেচনা করেন, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশে রয়েছে। কিন্তু এ সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও প্রকৃত বিনিয়োগে রূপ দিতে নীতিগত সংস্কারের ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
তার ভাষায়, সংস্কারের উদ্যোগকে দৃশ্যমান ও পূর্বানুমানযোগ্য ফলাফলে রূপ দিতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করা সম্ভব।
আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় সময় প্রয়োজন বলে জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি আগের সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া হয়েছে। আর্থিক খাতের পাশাপাশি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন হবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার কাজ করছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্যাসের ক্ষেত্রে ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট, স্থলভিত্তিক সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতেও উৎপাদন ও সঞ্চালন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সরকার ভবিষ্যতে একটি মিশ্র জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় বলেও জানান তিনি। এ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ থাকবে। কয়লাকে দেশের একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও কাজ করার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তার আশা, যথাসময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জনে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো অপরিহার্য। দেশের সব নাগরিকের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়া এবং প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশের জন্যও শক্তিশালী ইন্টারনেট প্রয়োজন।
অন্যদিকে ব্যাংক খাতের সংকটকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, ব্যাংকগুলোতে মূলধনের ঘাটতি এতটাই বেশি যে সরকারের পক্ষে এককভাবে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণও অনেক বেশি। এ কারণে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি করা প্রয়োজন।
ট্যারিফনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আসার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে শুধু ট্যারিফের ওপর নির্ভর করে টেকসই হতে পারে না। মূল্য সংযোজন কর, ভোগব্যয় ও আয় থেকে কর আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক পরিসর বর্তমানে সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে দ্রুত কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য মূলধনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, একটি স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ বিনিয়োগ আস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরো সহজ করা গেলে দেশী ও বিদেশী—উভয় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে বড় ভোক্তা বাজার, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শিল্পভিত্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন খাতের বিকাশের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে উদীয়মান ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিদেশী বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়ছে। তবে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে শুধু বাজারের আকার বা উৎপাদন সক্ষমতা নয়, নীতির স্থায়িত্ব ও বাস্তবায়নের নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মতে, নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।
আলোচনায় ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক মো. ফজলুল হক, ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান, কোকা-কোলা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব আহমেদ খান এবং অ্যামচেমের সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সামগ্রিকভাবে আলোচনায় উঠে আসে, বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা থাকলেও সেটিকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে নীতিগত সংস্কারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ-গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ, কর ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করার মতো বিষয়গুলোতে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রী যেখানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট কাটাতে অন্তত দুই বছরের সময়ের কথা বলেছেন, সেখানে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা হলো—এই সময়ের মধ্যেই সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নের এমন অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে, যা বিনিয়োগের ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করবে। কারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শুধু নীতির ঘোষণা নয়, সেই নীতির ধারাবাহিকতা ও বাস্তব প্রয়োগই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।