সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের পারিবারিক পুনর্মিলন কিউ–১ ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের যাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। একই সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উঠে এসেছে বিদেশি বিয়ের আড়ালে প্রতারণা, জোরপূর্বক বিদেশে পাঠানো এবং নির্যাতনের অভিযোগ। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়; প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তবে পরিসংখ্যান ও অভিযোগের এই সমান্তরাল প্রবণতা রাষ্ট্রকে সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ দিচ্ছে।
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সংখ্যা—৪,২২৬। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারী চীনে যাওয়ার জন্য কিউ–১ বা পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা নিয়েছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো বৃদ্ধির গতি। ২০২২ সালে যেখানে এই ভিসা নিয়েছিলেন মাত্র ৩৫ জন, সেখানে ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১,০১৬ জনে। ২০২৪ সালে ১,৩৭৮ এবং ২০২৫ সালে আরও বেড়ে ১,৭২১ জনে পৌঁছে যায়।
এই তথ্যকে মানবপাচারের পরিসংখ্যান বলা যাবে না। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় শূন্য থেকে হাজারের ঘরে পৌঁছে যাওয়া একটি অভিবাসন ধারা অবশ্যই ব্যতিক্রমী। প্রশ্ন হলো—এটি কি কেবল আন্তদেশীয় বিবাহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, নাকি এর আড়ালে সক্রিয় হয়েছে সংঘবদ্ধ দালালচক্র?
অভিযোগের নকশা: পাহাড় থেকে উপকূল
বিভিন্ন জেলার অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের মধ্যে একটি অস্বস্তিকর মিল রয়েছে। রাঙামাটির এক চাকমা পরিবারের দাবি, তাদের মেয়েকে ঢাকায় এনে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। খাগড়াছড়ির এক মারমা নারীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। আবার বাগেরহাটের এক তরুণীর অভিযোগ আরও ভয়াবহ—তাকে মাদক খাইয়ে অচেতন করা হয়, ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় এবং পরে চীনে পাঠিয়ে নির্যাতন করা হয়।
মানবপাচারকারীরা খুব কম ক্ষেত্রেই ভয় দেখিয়ে যাত্রা শুরু করে। তারা শুরু করে স্বপ্ন দিয়ে।
বলা হয়—বিদেশে বড় বাড়ি, ধনী স্বামী, নিশ্চিন্ত জীবন, পরিবারের আর্থিক উন্নতি। কখনো চাকরির প্রতিশ্রুতি, কখনো স্থায়ী নাগরিকত্বের ইঙ্গিত, কখনো পরিবারের হাতে মোটা অঙ্কের অর্থ তুলে দেওয়ার প্রলোভন। এই স্বপ্নের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে, একজন নারীকে চীনে পাঠানোর মধ্যস্থতায় ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। জাল নথি, ভুয়া ঠিকানা ও সন্দেহজনক বিয়ের কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
বৈধ বিয়ে আর ভুয়া বিয়ের সীমারেখা কোথায়?
একজন বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করা কোনো অপরাধ নয়। হাজারো আন্তদেশীয় পরিবার সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করছে। তাই চীনা নাগরিককে বিয়ে করা মানেই পাচার—এমন ধারণা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি প্রতারণার অভিযোগগুলোকে উপেক্ষা করাও সমান দায়িত্বহীনতা।
বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি এখন পদ্মা সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। উৎপাদনশিল্প, প্রযুক্তি, ওষুধ, টেলিযোগাযোগ ও শিল্পাঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ ক্রমাগত বাড়ছে। এই সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ—কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করছে।
মাদক, সাইবার অপরাধ ও নতুন বাস্তবতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে মাদক উৎপাদন, সাইবার জালিয়াতি ও অনলাইন জুয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। গত মার্চে উত্তরা এলাকায় একটি অস্থায়ী কেটামিন কারখানার সন্ধান পেয়ে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রায় ৬ দশমিক ৩ কেজি কেটামিন উদ্ধারের কথাও জানানো হয়। অন্য কয়েকটি অভিযানে বিপুলসংখ্যক সিম কার্ড ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার হয়েছে।
বিদেশি বিয়ের আড়ালে নারী পাচারের অভিযোগ শুধু বাংলাদেশের নয়। মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও লাওসেও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারীদের প্রতারণার মাধ্যমে চীনে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়ার ঘটনা বিভিন্ন সময়ে নথিভুক্ত হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, দুর্বল পরিচয় যাচাই এবং শক্তিশালী দালাল নেটওয়ার্ক মিলেই এই অপরাধের পরিবেশ তৈরি করে।
কী করতে হবে রাষ্ট্রকে?
শুধু নতুন আইন করলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থা। পুলিশ, সিআইডি, বিশেষ শাখা, ইমিগ্রেশন, স্থানীয় প্রশাসন ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করে কোনো নারী দেশ ছাড়লে সেই তথ্য ঝুঁকি বিশ্লেষণের আওতায় আনা গেলে সন্দেহজনক প্রবণতা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
চীনের সহযোগিতাও কেন জরুরি
কোনো বাংলাদেশি নারী বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হলে তদন্তের বড় অংশই নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর। বিয়ের নথি, স্বামীর পরিচয়, ব্যাংক লেনদেন, বসবাসের ঠিকানা ও মধ্যস্থতাকারীদের তথ্য জানতে দুই দেশের তদন্তকারী সংস্থার সমন্বয় অপরিহার্য। যৌথ তদন্ত, তথ্য বিনিময় এবং ভুক্তভোগীকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে হবে।
শেষ কথা: আতঙ্ক নয়, জবাবদিহি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি হলো—৪,২২৬ জন নারী কিউ–১ ভিসা নিয়েছেন মানেই ৪,২২৬টি পাচারের ঘটনা ঘটেছে, এমন দাবি করার কোনো ভিত্তি নেই। আবার অভিযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।