ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরামর্শেই ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর সেই সিদ্ধান্তের ফল নিয়েই এখন যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা চালানোর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প তাঁর গোয়েন্দাপ্রধানকে ওভাল অফিসে ডেকে পাঠান। পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা কার্যকর হবে, সেটিই জানতে চেয়েছিলেন তিনি।
তবে ওই সময় ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ এক সহকারী এবং নেতানিয়াহু তাঁকে বোঝান, ইরান কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ফলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার পাশাপাশি ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার এটি বিরল সুযোগ। একই সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেকে একজন ‘শান্তিদূত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সুযোগও ট্রাম্পের সামনে তৈরি হয়েছে বলে তাঁকে বোঝানো হয়।
কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন ছিল অনেক বেশি সতর্ক। তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাঁর মতে, এর ফলে ইরানে আরও কট্টরপন্থী একটি সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে, যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ব্যাপারে আরও আগ্রহী হবে।
গ্যাবার্ড আরও সতর্ক করেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে হত্যার পর তেহরান দ্রুত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকিও ছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এবং মিত্রদের কাছে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল।
শুধু গোয়েন্দা সংস্থাই নয়, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও ট্রাম্পকে যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি বাড়বে, অস্ত্রের মজুত কমে যাবে এবং আগে থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
কিন্তু এসব সতর্কতার পরও ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার নির্দেশ দেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি ইরানের জনগণকে তাঁদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। ট্রাম্পের ঘোষণা ছিল, যুদ্ধ ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। বাস্তবে সেই সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। ছয় মাস পরও যুদ্ধের কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখনো দেশটির নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। হরমুজ প্রণালিতেও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন তেহরানের সরকারও আত্মসমর্পণের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
ফলে যে যুদ্ধকে দ্রুত ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন ট্রাম্প, সেটিই এখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো নতুন পারমাণবিক চুক্তি না হলেও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া গেলে সেটিকেই সম্ভাব্য বিজয় হিসেবে ঘোষণা করার কথা ভাবছেন ট্রাম্প।
যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর। এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ইরানি এবং ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, আহত হয়েছেন আরও ৭৫৬ জন মার্কিন সেনা। সংঘাতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেল সরবরাহ ও দামের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবেও ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
ট্রাম্পের প্রত্যাশা ছিল, যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাবে এবং একই সঙ্গে তিনি নিজেকে একজন সফল যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। কিন্তু হোয়াইট হাউস ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের সহজ কোনো পথ এখন আর নেই।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের প্রশাসনের অধীনেই কাজ করা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের ডেপুটি ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক ব্রিউয়ারের ভাষায়, যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির প্রায় সবকিছুই আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল।
হোয়াইট হাউস অবশ্য গোয়েন্দা মূল্যায়ন উপেক্ষার অভিযোগ মানতে চায় না। একজন কর্মকর্তা বলেছেন, পেন্টাগন ট্রাম্পকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নিরপেক্ষ ও সঠিক তথ্য দিয়েছিল এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
যুদ্ধের শুরুতে অবশ্য ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস ছিল তুঙ্গে। ২৮ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরুর পর সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ মার-এ-লাগোতে একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে তাঁকে জানান, ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। খবরটি শুনে ট্রাম্প এতটাই উচ্ছ্বসিত হন যে উপস্থিত অতিথিদের সামনে তা ঘোষণা করতে তাঁদের বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিরা করতালি ও উল্লাসে প্রতিক্রিয়া জানান।
কিন্তু যুদ্ধ যত গড়িয়েছে, সেই উচ্ছ্বাস ততই ম্লান হয়েছে। সামরিক ক্ষয়ক্ষতি, মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা, অস্ত্র ও সরঞ্জামের ক্ষতি এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ পরই প্রেসিডেন্টের সামনে প্রশ্ন দেখা দেয়—এই সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করছে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প দ্বিধায় ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি তখন তাঁকে যুদ্ধ শেষ করার পরামর্শ দেন। পরে ১৭ জুন একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ৬০ দিনের পারমাণবিক আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কিন্তু সেই সমঝোতাও স্থায়ী হয়নি। চুক্তির পরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালিতে আবার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। এতে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন এবং বিষয়টিকে নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেন।
এরপর আবারও আলোচনার বদলে চাপ প্রয়োগের পথেই ফিরে যায় ওয়াশিংটন। পারমাণবিক আলোচনার ৬০ দিনের সময়সীমা ১৭ আগস্ট শেষ হয়েছে। এর তিন দিন পর অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।
অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরও যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেই একই প্রশ্নের মুখোমুখি—ইরানকে কীভাবে চাপে রাখা যাবে এবং একই সঙ্গে কীভাবে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। সামরিক অভিযান দিয়ে দ্রুত ফল পাওয়ার যে হিসাব থেকে ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, বাস্তবতা তার সঙ্গে মিলছে না। বরং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে ঝুঁকিগুলোর কথা আগে থেকেই জানিয়েছিল, তার অনেকগুলোই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বাস্তব সমস্যা হিসেবে হাজির হয়েছে।