ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী আজ যে কথাগুলো বলেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি সম্ভবত একটিই—“Bangladesh is a vibrant, sovereign & independent country. So is India. Nobody is big and nobody is small. We are all equals, and we have to work on that footing.”
খুব ভালো।
কথাটা শুনতে ভালো লাগছে।
কিন্তু এর চেয়েও ভালো লাগার বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত ভারতীয় কূটনীতিককেই এখন এসে বলতে হচ্ছে—কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়, আমরা সবাই সমান।
কেন বলতে হচ্ছে? কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের পুরোনো কাঠামোটা আর আগের জায়গায় নেই।
বাংলাদেশও বদলেছে। বাংলাদেশের মানুষও বদলেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিন্তাও বদলেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ এখন আর ভারতের দিকে তাকিয়ে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করে না।
এটাই নতুন বাস্তবতা।
একটা সময় ছিল, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হলেই যেন ধরে নেওয়া হতো, ভারত কী চায় সেটাই আসল প্রশ্ন। দিল্লি কী ভাবছে, ভারত কী বলছে, ভারত কোন অবস্থান নেবে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা উষ্ণ থাকবে—এসব দিয়েই বাংলাদেশের কূটনৈতিক কথাবার্তার বড় অংশ ব্যাখ্যা করা হতো।
সেই সময়টা শেষ।
আজ প্রশ্নটা উল্টো। বাংলাদেশ কী চায়?
বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থকে কীভাবে দেখছে?
বাংলাদেশ কাদের সঙ্গে সম্পর্ক করবে, কী ধরনের সম্পর্ক করবে, কোথায় সহযোগিতা করবে, কোথায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করবে—এসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নিজেই নেবে।
ভারত সেই সিদ্ধান্তের অংশীদার হতে পারে।
নির্ধারক নয়।
এটা বুঝতে পারাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
দিনেশ ত্রিবেদী বলছেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম, স্বাধীন, প্রাণবন্ত দেশ। খুব স্বাভাবিক কথা। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন কোনো পরিচয় নয়। বাংলাদেশ ১৯৭১ সাল থেকেই সার্বভৌম। স্বাধীন। নিজের পতাকা, নিজের ভূখণ্ড, নিজের জনগণ, নিজের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশ্নটা বরং এতদিনে ভারত এই বাস্তবতাকে কতটা গভীরভাবে গ্রহণ করেছে।
কারণ সার্বভৌমত্ব শুধু কাগজে থাকা বিষয় নয়।
সার্বভৌমত্ব মানে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করা।
সার্বভৌমত্ব মানে নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জায়গা নিজে ঠিক করা।
সার্বভৌমত্ব মানে অন্য কোনো দেশের পছন্দকে নিজের রাজনৈতিক বাস্তবতার মাপকাঠি না বানানো।
আর এখানেই বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে একটি শিক্ষা পেয়েছে—অন্যের পছন্দের ওপর নিজের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ দাঁড় করানো যায় না।
কোনো দেশ যত বড়ই হোক, তার রাজনৈতিক পছন্দ বাংলাদেশের মানুষের ভোটের বিকল্প হতে পারে না।
কোনো প্রতিবেশী যত শক্তিশালীই হোক, বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্তের ওপর তার অভিভাবকত্ব থাকতে পারে না।
কোনো নেতা কোনো দেশের কাছে যতই গ্রহণযোগ্য হোন, বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের মানুষ।
এই জায়গাটা এখন আগের চেয়ে অনেক পরিষ্কার।
আর সেটাই বাংলাদেশের শক্তি।
দিনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যের আরেকটি জায়গা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, দুই দেশ পরস্পরের উন্নয়নের জন্য একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বলেছেন, এই সম্পর্কটা একটা পরিবারের মতো।
এখানেও কথা ভালো।
কিন্তু একটা বিষয় ভারতকেও মনে রাখতে হবে—পরিবারে শুধু বয়স বা আকার দিয়ে মর্যাদা নির্ধারিত হয় না।
ভারত বড় অর্থনীতি—সেটা সত্যি।
ভারত বড় ভূখণ্ড—সেটাও সত্যি।
ভারত বড় সামরিক শক্তি—সেটিও সত্যি।
কিন্তু বাংলাদেশেরও এমন কিছু আছে, যেগুলোর মূল্য আয়তন দিয়ে মাপা যায় না।
বাংলাদেশের অবস্থান আছে।
বঙ্গোপসাগরের দরজা আছে।
বিশাল ভোক্তা বাজার আছে।
দক্ষ শ্রমশক্তি আছে।
রপ্তানিমুখী শিল্প আছে।
আঞ্চলিক যোগাযোগের বাস্তব গুরুত্ব আছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভারতের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা আছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের নিজস্ব জনগণ ও নিজস্ব অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে।
অর্থাৎ সম্পর্কের হিসাব শুধু এমন নয় যে বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল।
ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্কের প্রয়োজন অনুভব করে।
এই জায়গাটা বাংলাদেশের আরও দৃঢ়ভাবে বোঝা দরকার।
কারণ এতদিন আমাদের আলোচনায় একটা অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব ছিল—ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা যেন বাংলাদেশের প্রয়োজন, কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা যেন ভারতের জন্য এক ধরনের সৌজন্য।
এই ধারণা ভুল।
খুবই ভুল।
ভারত বাংলাদেশের পাশের দেশ।
বাংলাদেশও ভারতের পাশের দেশ।
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনীতি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগরমুখী বাণিজ্য, সীমান্ত অর্থনীতি, আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা—সবকিছুর ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ একটি বাস্তব ভূরাজনৈতিক অংশ।
সুতরাং দুই দেশের সম্পর্ক কোনো দয়া বা অনুগ্রহের সম্পর্ক নয়।
এটা প্রয়োজনের সম্পর্ক।
আর যে সম্পর্ক প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হয়, সেখানে আত্মসম্মান নিয়ে দাঁড়ানোর জায়গাটা আরও শক্ত হয়।
এখন দিনেশ ত্রিবেদী ব্যবসা-টু-ব্যবসা সম্পর্কের কথা বলেছেন।
এটা নিয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হা করে তাকিয়ে থাকার কিছু নেই।
বাংলাদেশের ব্যবসা ভারতের দরকার যেমন, ভারতের ব্যবসাও বাংলাদেশের বাজার ও ভৌগোলিক সুবিধা থেকে লাভবান হতে পারে।
বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্য কিনবে।
ভারত বাংলাদেশি পণ্য কিনবে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ হবে।
ভারতেও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান যাবে।
দুই দেশের শিল্প একে অপরের সঙ্গে কাজ করবে।
এটাই বাজার অর্থনীতি।
এখানে কেউ কাউকে দয়া করছে না।
কেউ কাউকে উপকার করছে না।
দুই পক্ষই নিজের লাভের হিসাব করছে।
একই কথা সীমান্তের ক্ষেত্রেও।
দুই দেশের সীমান্ত থাকলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমস্যা হবে, অপরাধ হবে, চোরাচালান হবে, অনুপ্রবেশের অভিযোগ থাকবে—এসব মোকাবিলা করতে আইন আছে, বাহিনী আছে, দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা আছে।
কিন্তু একটি জিনিস কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না—সীমান্তে বাংলাদেশি মানুষের জীবন তুচ্ছ হয়ে যাওয়া।
এখানেও বাংলাদেশ কারও কাছে কিছু চেয়ে বসে নেই।
বাংলাদেশ তার অবস্থান জানে।
সীমান্তে আইন থাকবে।
নিরাপত্তা থাকবে।
দুই পক্ষের দায়িত্ব থাকবে।
কিন্তু একজন বাংলাদেশি নাগরিকের জীবনও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ—এটা বোঝানোর জন্য বাংলাদেশের কারও অনুমতি লাগবে না।
পানির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা।
তিস্তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জীবনব্যবস্থার অংশ।
গঙ্গা বাংলাদেশের কৃষি ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির অংশ।
অভিন্ন নদীর পানি কোনো সৌজন্যমূলক উপহার নয়।
বাংলাদেশের নদীর পানি নিয়ে কথা বলার অধিকার বাংলাদেশের আছে।
হিস্যা নিয়ে কথা বলার অধিকার বাংলাদেশের আছে।
ন্যায্যতা নিয়ে কথা বলার অধিকার বাংলাদেশের আছে।
এখানে ‘ভারত কী দেবে’—এই ভাষাটিই ঠিক নয়।
বরং প্রশ্ন হলো, দুই দেশের অভিন্ন নদীগুলোকে দুই দেশ কীভাবে ন্যায্য ও টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনা করবে।
বাংলাদেশ সেই আলোচনায় সমান পক্ষ।
বরং একটি ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন—এটাও ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দিনেশ ত্রিবেদী মহাত্মা গান্ধীর কথা বলেছেন—সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের কথা ভাবতে হবে।
কথাটি ভালো।
কিন্তু বাংলাদেশ এখন নিজের জনগণকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দিল্লির কোনো উপদেশের অপেক্ষায় নেই।
বাংলাদেশের কৃষক কী চায়, বাংলাদেশ জানে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী কী চায়, বাংলাদেশ জানে।
বাংলাদেশের শ্রমিক কী চায়, বাংলাদেশ জানে।
বাংলাদেশের তরুণরা কী চায়, বাংলাদেশ জানে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে নিতে হবে, সেটিও বাংলাদেশ নিজের অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা ও প্রয়োজন থেকেই ঠিক করবে।
ভারতের নীতি বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণ করবে না।
বরং দুই দেশের নীতির মধ্যে যেখানে মিল আছে, সেখানেই সহযোগিতা হবে।
এটাই পরিণত সম্পর্ক।
এবার আসি রাজনীতিতে।
এখানেই দিনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকট আসলে বাণিজ্য নয়, সীমান্ত নয়, পানি নয়।
বিশ্বাস।
দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
এর পেছনে গত কয়েক বছরের নানা ঘটনা আছে।
বাংলাদেশের মানুষের বড় একটি অংশ মনে করেছে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের পাশাপাশি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি ও শক্তির সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্ক করেছে, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়েছে।
কিন্তু এখানেও একটা বিষয় স্পষ্ট।
বাংলাদেশ এখন আর ভারতের রাজনৈতিক পছন্দের জায়গা অনুযায়ী নিজের রাজনীতি সাজাবে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের মানুষ ঠিক করবে।
কে ক্ষমতায় থাকবে, কে বিরোধী থাকবে, কে জনগণের সমর্থন পাবে—এসবের সিদ্ধান্ত ঢাকায় হবে।
দিল্লিতে নয়।
এখানে বাংলাদেশ কোনো ব্যতিক্রম দাবি করছে না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির খুব সাধারণ নিয়মই বলছে, একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সেই দেশের জনগণ নির্ধারণ করবে।
এই জায়গায় ভারত যত দ্রুত বাস্তববাদী হবে, দুই দেশের সম্পর্ক তত দ্রুত স্বাভাবিক হবে।
কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে বড় ভুল হবে—বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের মধ্য দিয়ে দেখা।
বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি নয়।
বাংলাদেশ কোনো দলও নয়।
বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র।
এই রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হলে রাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে হবে।
দিনেশ ত্রিবেদী আজ বলেছেন, “We are all equals.”
বাংলাদেশের জন্য এই বাক্যটি গ্রহণ করার মতো নতুন কিছু নেই।
বাংলাদেশ বরং বলছে—হ্যাঁ, এটাই স্বাভাবিক।
আর স্বাভাবিক বলেই এ নিয়ে বিশেষ কোনো কৃতজ্ঞতারও প্রয়োজন নেই।
কারণ বাংলাদেশ সমান মর্যাদা পাওয়ার জন্য কারও কাছে আবেদন করছে না।
এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এখানেই বাংলাদেশের অবস্থান আগের চেয়ে অনেক শক্ত।
বাংলাদেশ এখন জানে, তার বিকল্প আছে।
তার অর্থনৈতিক বিকল্প আছে।
তার কূটনৈতিক বিকল্প আছে।
তার বাণিজ্যিক অংশীদার আছে।
তার আঞ্চলিক সম্পর্ক আছে।
তার বৈশ্বিক অংশীদারত্ব আছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে—অবশ্যই থাকবে।
কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা মানেই বাংলাদেশের অন্য সব দরজা বন্ধ থাকবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
বাংলাদেশ একসঙ্গে বহু দেশের সঙ্গে কাজ করতে পারে।
এটাই স্বাভাবিক বহুমাত্রিক কূটনীতি।
ভারতেরও তাই বাংলাদেশকে নিয়ে অতিরিক্ত মালিকানাবোধ রাখার কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশ কারও প্রভাববলয়ের স্থায়ী সম্পত্তি নয়।
কোনো দেশের ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তাবলয়ের স্বয়ংক্রিয় অংশও নয়।
বাংলাদেশ নিজের কৌশলগত অবস্থান নিজেই নির্ধারণ করবে।
এই বাস্তবতা মেনে নেওয়াই দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তি দিতে পারে।
দিনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ‘পারস্পরিক নির্ভরতা’ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ বলছে—অবশ্যই।
কিন্তু আন্তঃনির্ভরতা মানে এক পক্ষের ওপর আরেক পক্ষের নিয়ন্ত্রণ নয়।
বরং এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে দুই দেশই জানবে—সহযোগিতা করলে দুই পক্ষের লাভ, সম্পর্ক খারাপ হলে দুই পক্ষেরই ক্ষতি।
এই জায়গাটাই প্রকৃত শক্তি।
বাংলাদেশের এখন সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে।
ভারতকে নিয়ে অতিরিক্ত আবেগ নয়।
অতিরিক্ত ভয়ও নয়।
অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয়।
আবার অকারণ শত্রুতাও নয়।
কেবল স্বার্থ।
বাংলাদেশের স্বার্থ।
সেখানেই পররাষ্ট্রনীতি স্থির হবে।
দিনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যকে তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি সৌজন্যমূলক বক্তব্য হিসেবে না দেখে বরং একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়।
কিন্তু পরিবর্তনের প্রমাণ হবে না কথায়।
প্রমাণ হবে সম্পর্কের মানসিকতায়।
ভারত বাংলাদেশকে কীভাবে দেখছে, সেটাই আসল।
সহযোগী হিসেবে?
সমমর্যাদার প্রতিবেশী হিসেবে?
নাকি এখনো এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে, যার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের শক্তির হিসাবটাই আগে আসে?
এই প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে।
তবে বাংলাদেশের জায়গা থেকে একটি বিষয় আজই পরিষ্কার করে দেওয়া যায়।
বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে নয়।
কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের নিচেও নয়।
বাংলাদেশ ভারতের ছায়ায় নয়।
বাংলাদেশ ভারতের রাজনৈতিক অনুমোদনে নয়।
বাংলাদেশ ভারতের দয়ার ওপর নয়।
বাংলাদেশ নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে।
নিজের অর্থনীতির শক্তিতে।
নিজের জনগণের শক্তিতে।
নিজের কূটনীতির শক্তিতে।
নিজের স্বাধীনতার ইতিহাসের শক্তিতে।
আর এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক করতে চায়।
সমান চোখে।
সমান মর্যাদায়।
সমান স্বার্থে।
সুতরাং দিনেশ ত্রিবেদী সাহেব, আপনি বলেছেন—কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়।
বাংলাদেশ বলছে—ঠিক আছে।
তাহলে এবার এই কথাটাকে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবেই ধরে নেওয়া যাক।
বাংলাদেশকে ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।
ভারতকেও বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থের হিসাব করতে হবে।
দুই দেশই নিজের সিদ্ধান্ত নেবে।
দুই দেশই নিজের স্বার্থ রক্ষা করবে।
যেখানে স্বার্থ মিলবে, সেখানে একসঙ্গে হাঁটবে।
যেখানে মিলবে না, সেখানে দূরত্ব থাকবে।
অভিভাবকত্বের পরিকল্পনা ভুলেও মাথায় আনবেন না।
এটাই নতুন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত।
আর এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে আর কারও কাছ থেকে প্রমাণ নিতে হবে না যে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ—কারণ বাংলাদেশ নিজেই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতা বুঝতে পারাটাই হয়তো দিনেশ ত্রিবেদীর আজকের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
আর যদি দিল্লি সত্যিই সেই শিক্ষা নেয়, তাহলে সম্পর্কের ভাষা বদলাবে।
কেবল হাইকমিশনারের কথায় নয়।
নীতিতেও।
আচরণেও।
এবং শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কেও।
বাংলাদেশের জন্য সেটাই যথেষ্ট।
কারণ বাংলাদেশ কারও কাছ থেকে বড় হওয়ার সার্টিফিকেট চায় না।
বাংলাদেশ শুধু নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে চায়।
আর সেই জায়গাটা হলো—একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, আত্মমর্যাদাশীল এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করতে সক্ষম রাষ্ট্র।![]()