৩৮৪ পর্যটক নিখোঁজ, তাঁদের ২৯১ জন বিদেশি; তিব্বতেও নিহত ৩, নিখোঁজ ২৬৫ — নদীর গতিপথ আটকে হঠাৎ নেমে আসে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত
নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় বুধবার আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের তীব্র স্রোত নেমে আসে লোকালয়ে। এতে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগের প্রায় আট ঘণ্টা পরও ৩৮৪ পর্যটকের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন। একই সময়ে সীমান্তের ওপারে তিব্বতের গিরং এলাকায়ও ভূমিধস ও বন্যায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
দুই দেশের সীমান্তঘেঁষা এই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে দুর্যোগের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে অনেক জায়গায় উদ্ধারকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যদের মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সতর্ক করেছে নেপাল পুলিশ। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
কীভাবে শুরু হলো আকস্মিক বন্যা
দুর্যোগটির সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নেপালের অংশে একটি পাথুরে বরফধস বা বরফ-পাথরের ধসের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। এর ফলে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি জমে যায়। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে তীব্র স্রোত নেমে আসে নিচের দিকে।
সংস্থাটির রিমোট সেন্সিং ও ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ বলেন, চীন সীমান্তের দিকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের ধারণা, নেপাল অংশে একটি পাথুরে বরফধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে একের পর এক তীব্র বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।’
এই ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঘটনাটি সাধারণ বর্ষার বন্যার মতো ছিল না। পাহাড়ি নদীর গতিপথ কোনো কারণে হঠাৎ আটকে গেলে অল্প সময়ে সেখানে বিপুল পানি জমতে পারে। সেই বাধা ভেঙে গেলে নিচের দিকে নেমে আসা পানির সঙ্গে বরফ, পাথর, কাদা, গাছপালা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হয়ে তা অনেক বেশি বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে।
নদীর দুই কূল উপচে এভাবেই তীব্র স্রোত নেমে আসে চীন-নেপাল সীমান্তের একটি নদী থেকে। বহু ভবন কাদামাটি ও পানির নিচে চাপা পড়ে। নদীর তীরবর্তী বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজারে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও চারদিকে ছিল কাদামাটির পুরু স্তর ও ধ্বংসযজ্ঞ।
আট ঘণ্টা পরও নিখোঁজ ৩৮৪ পর্যটক
দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা। নেপালের পর্যটন বোর্ডের হিসাবে, ৩৮৪ পর্যটকের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং নদীর প্রবল স্রোতের কারণে তাঁদের সন্ধানে অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের রাজু ভাদেল, ৫৬, জানান, বন্যার ভয়াবহতার খবর তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আজ সকালে আমার ভগ্নিপতি আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁরা কাঁদছিলেন এবং বলছিলেন যে তাঁদের পুরো বাড়িটি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা গেলেও তাঁর ভাই এখনো নিখোঁজ।’
নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, নদীর প্রবল স্রোতে বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। ত্রিশূলী বাজারের ছবিতে কোথাও বাড়ির কেবল ওপরের অংশটি কাদার ওপর দেখা যাচ্ছে। কোথাও রাস্তার ওপর জমে আছে পুরু কাদামাটি। পানির তোড়ে অনেক স্থাপনা ও সড়ক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুলিশের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সতর্ক করা হয়েছে।
সীমান্তের ওপারেও ভয়াবহ পরিস্থিতি
নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বতেও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরংয়ে তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল সীমান্তের তিব্বত বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসের কারণে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।
সিসিটিভির প্রকাশিত ভিডিওতে তীব্র স্রোতের সঙ্গে গাছের ডালপালা ও ধ্বংসাবশেষ ভেসে যেতে দেখা গেছে। সড়কের বিভিন্ন অংশও পানিতে ডুবে যায়। তবে ভিডিওটির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
তিব্বতের শিগাতসের ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, ওই এলাকার সড়কগুলো ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় আঘাত
বন্যায় শুধু জনবসতি ও সড়ক যোগাযোগ নয়, নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘এই দুর্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।’
দুর্যোগের কারণে কয়েকটি মহাসড়কও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো এবং উদ্ধারকাজ পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার এবং দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মী পাঠিয়েছে। নদীর স্রোত ও কাদামাটিতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতিও ব্যবহার করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখন দুর্যোগটি এখানেই শেষ হয়েছে কি না, তা নিয়ে। ইসিমোডের জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করেছেন, খুব দ্রুত আরেকটি বন্যা দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্ত নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।’
অর্থাৎ প্রথম দফার বন্যার পানি নেমে গেলেও বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। নদীর উজানে যদি কোথাও পানি বা ধ্বংসাবশেষ আটকে থাকে, সেটি নতুন করে ভেঙে পড়লে আবারও আকস্মিক স্রোত নেমে আসতে পারে। এ কারণে নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বর্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রশ্ন
জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষাকাল। এই সময়ে নেপালসহ হিমালয়ঘেঁষা অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধস নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এবারের মতো আকস্মিক ও ভয়াবহ ঘটনা পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্যোগঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে এবং এসব দুর্যোগের তীব্রতাও বাড়ছে। হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বরফ ও হিমবাহের পরিবর্তন এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির অস্থিতিশীলতার সঙ্গে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।
এই অঞ্চলের নদীগুলোও বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভোতে কোশি নদী নেপালে প্রবেশ করে পরে ত্রিশূলী নদীতে মিশেছে। ফলে উজানে কোনো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত নিচের দিকে বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গত বছরও জিরং বন্দরের কাছে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছিল। সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ১৭ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। অর্থাৎ সীমান্তের এই পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি নতুন নয়। এবারের ঘটনা সেই ঝুঁকির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এক নজরে দুর্যোগ
নেপালে নিহত: অন্তত ৯৫ জন
নিখোঁজ পর্যটক: ৩৮৪ জন
নিখোঁজ বিদেশি পর্যটক: ২৯১ জন
তিব্বতে নিহত: ৩ জন
তিব্বতে নিখোঁজ: ২৬৫ জন
ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা: প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট
প্রধান সম্ভাব্য কারণ: পাথুরে বরফধসে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে আকস্মিক প্রবল স্রোত সৃষ্টি
তাৎক্ষণিক ঝুঁকি: উজানে নদীর প্রতিবন্ধকতা ভেঙে দ্বিতীয় দফা বন্যা
দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। উদ্ধারকর্মীরা একদিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করছেন, অন্যদিকে নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়া ঘরবাড়ি, বিচ্ছিন্ন সড়ক এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই ঘটনা তাই শুধু একটি আকস্মিক বন্যার ঘটনা নয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া, পাহাড় থেকে বরফ ও পাথরের ধস নামা এবং তার সঙ্গে বিপুল কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত মিলে কীভাবে একটি পুরো জনপদকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, ত্রিশূলী বাজার থেকে সীমান্তের তিব্বত পর্যন্ত তারই ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে। আর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা রয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেই নতুন বন্যার শঙ্কাও কাটছে না।![]()