২৭ আগস্ট ২০২৬
নেপালের মধ্যাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৭ জনে পৌঁছেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৪০৩ জন, যাঁদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি পর্যটক। উদ্ধারকারীরা আশঙ্কা করছেন, ধ্বংসস্তূপ ও নদীর স্রোতে আরও অনেক মানুষ আটকে থাকতে পারেন।
বুধবার সকালে বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, গোর্খা, তানাহুঁ ও নওয়ালপুর জেলায় কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধস আঘাত হানে। ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে; বহু গ্রাম, সেতু ও সড়ক পানির তোড়ে ভেসে গেছে।
![]()
যেসব জেলায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ান জেলায়। এছাড়া ধাদিং, গোর্খা ও নুয়াকোটেও ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
জেলা অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া মরদেহ
নেপাল পুলিশের প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব
নিখোঁজদের বেশির ভাগই বিদেশি পর্যটক
নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের অধিকাংশ ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরগামী পর্যটক ছিলেন।
নিখোঁজ বিদেশি নাগরিক
পর্যটন বোর্ডের প্রকাশিত প্রধান তিন দেশের সংখ্যা
জানা গেছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। মোট ২৬টি দেশের নাগরিক এ দুর্যোগে নিখোঁজ রয়েছেন।
চোখের সামনে ভেসে গেল পুরো বাড়ি
5
রসুয়ার স্থানীয় বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী রাজু ভাদেল বলেন, সকালে তাঁর ভগ্নিপতি কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে জানান যে তাঁদের পুরো বাড়ি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও তাঁর ভাই এখনো নিখোঁজ।
পুলিশ ও সেনাবাহিনীর প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, নদীর তীব্র স্রোতে বাড়িঘর, যানবাহন ও সেতু মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় কাদামাটির নিচে শুধু ঘরের ছাদ দৃশ্যমান।
কেন ঘটল এই আকস্মিক বন্যা?
নেপালের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, তিব্বত অঞ্চলে বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে হওয়া ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কয়েক মিনিট পরই এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। যদিও ভূমিকম্প ও বন্যার সরাসরি সম্পর্ক এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য ভূমিধসে নদীর উজানে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হয়েছিল। পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আসে, ফলে ত্রিশূলী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইসিমোড সতর্ক করেছে, উজানে এখনো নদীর প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সেটি ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আরও বড় বন্যা দেখা দিতে পারে।
বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোয় বড় ধাক্কা
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন ও বিতরণব্যবস্থার ক্ষতির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
একই সঙ্গে বহু সড়ক ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গত এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও বিশেষায়িত উদ্ধার দল মোতায়েন করেছে।
তিব্বতেও প্রাণহানি
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তসংলগ্ন তিব্বতের গিরং এলাকায় একই দুর্যোগে অন্তত ৩ জন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সীমান্তবর্তী বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।
“প্রাণহানি ও সম্পদের এই ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত। উদ্ধার অভিযানে সরকারের সব সক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানো হয়েছে।” — নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ
![]()