রিমু রোজা খন্দকার
চুয়াডাঙ্গা থেকে খুব অল্প বয়সে ঢাকায় আসা একটা মেয়ে কীভাবে নিজের জায়গা তৈরি করেছিল—আমার মায়ের গল্পটা আসলে সেখান থেকেই শুরু।
তাঁর কোনো গডফাদার ছিল না।
কোনো পারিবারিক রেফারেন্স ছিল না।
কেউ হাত ধরে তাঁকে চলচ্চিত্রে নিয়ে আসেনি।
ছিল শুধু শেখার একটা অসম্ভব আগ্রহ আর নিজের জীবনটাকে নিজের মতো করে তৈরি করার জেদ।
ঢাকায় এসে পদাতিক নাট্যদলে আবদুল্লাহ আল মামুন স্যারের গ্রুপে যোগ দিলেন। মঞ্চে অভিনয় করলেন, থিয়েটার করলেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে এলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একজন অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পেলেন।
কিন্তু মায়ের কাছে অভিনয় মানেই শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো ছিল না।![]()
তিনি সিনেমা দেখতে ভালোবাসতেন। বিভিন্ন হাইকমিশন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আয়োজনে বিদেশি ছবি দেখার সুযোগ খুঁজতেন। রাশিয়ান,জার্মান, ব্রিটিশ, ভারতীয়—বিভিন্ন দেশের সিনেমা দেখতেন। সিনেমাকে শুধু বিনোদন হিসেবে দেখতেন না, বুঝতে চাইতেন।
আলমগীর কবির uncle এর “ফিল্ম ক্লাবের” সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। পরিচালনা শেখার আগ্রহ ছিল। একজন অভিনেত্রী হয়েও চলচ্চিত্রকে নির্মাতার চোখ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতেন।
আর তাঁর শেখার জায়গাটা শুধু সিনেমাতেই থেমে ছিল না।
সংসার করেছেন, সন্তান মানুষ করেছেন, অভিনয় করেছেন—তারপরও নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ম্যাট্রিক, এইচএসসি, ডিগ্রি শেষ করেছেন। ইংরেজি শেখার জন্য YMCA তে কোর্স করেছেন। বই পড়েছেন অসংখ্য, বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের সাথে উঠা-বসা ছিলো, কবিতা লিখেছেন, আর্টিকেল লিখেছেন, ডায়েরি লিখতেন।
সে শুধু নিজের আগ্রহ আর পরিশ্রম দিয়ে কতটা পথ পাড়ি দিয়েছিল!
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এত কিছু করার পরও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল আমার কাছে— ‘আমার মা’
আমার কী খেতে ভালো লাগে, কোন পোশাকে আমাকে ভালো লাগবে, কী করলে আমি খুশি হব—এই ছোট ছোট বিষয়গুলো তিনি মনে রাখতেন।
মৃত্যুর মাত্র কয়েক মিনিট আগেও তাঁর হাতে একটা বই ছিল ‘ঢেউ’
আজ মনে হয়, মা যদি আরও কিছু বছর পেতেন, তাহলে হয়তো তাঁর গল্পটা আরও অনেক বড় হতে পারত।
হয়তো আরও ভালো ভালো কাজে অভিনয় করতেন।
হয়তো পরিচালনা করতেন।
হয়তো আরও লিখতেন।
হয়তো আরও অনেক কিছু শিখতেন।
কিন্তু জীবন তাঁকে সেই সময়টুকু দেয়নি।
তবু তাঁর জীবনের দিকে তাকালে আমার মনে হয়—
কিছু মানুষ উত্তরাধিকার নিয়ে আসে না, নিজেরাই নিজেদের উত্তরাধিকার তৈরি করে যায়।
আমার ‘মা’ তেমনই একজন মানুষ ছিলেন
নিজের মেধা, পরিশ্রম আর শেখার ক্ষুধা দিয়ে তিনি নিজের একটা ‘পৃথিবী’ বানিয়েছিলেন।
আর সেই পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট, অথচ সবচেয়ে আপন মানুষটি ছিলাম ‘আমি’