চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের একজন শিক্ষার্থী থেকে দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী—এই পথটি একদিনে তৈরি হয়নি। প্রায় তিন দশক ধরে বিভিন্ন ব্যাংকে দায়িত্বশীল পদে কাজ, করপোরেট ব্যাংকিং ও ক্রেডিট রিস্ক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং ধারাবাহিক নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হয়েছেন তারেক রেফাত উল্লাহ খান।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম আলোচিত করপোরেট ব্যক্তিত্ব। নেতৃত্বের পাশাপাশি তাঁর পারিশ্রমিকও ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মাসিক মোট পারিশ্রমিক প্রায় ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা বার্ষিক হিসাবে প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার টাকায় পৌঁছায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু
তারেক রেফাত উল্লাহ খানের উচ্চশিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে তিনি বাণিজ্যে স্নাতক (বি.কম) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম এবং এমবিএ সম্পন্ন করেন। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যাংকিং, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব উন্নয়ন বিষয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল অর্থনীতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট ব্যবস্থাপনায়। সেই প্রস্তুতিই পরবর্তী সময়ে তাঁকে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
১৯৯৬ সালে ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের শুরু
ব্যাংকিং পেশায় তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৬ সালে আইএফআইসি ব্যাংকে। প্রায় সাত বছর সেখানে কাজ করে তিনি ঋণ ব্যবস্থাপনা, গ্রাহক সম্পর্ক ও করপোরেট সেবার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
এরপর তিনি যোগ দেন এবি ব্যাংকে। সেখানে করপোরেট ব্যাংকিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসিতে (ইবিএল) দীর্ঘ সময় কাজ করে বড় করপোরেট গ্রাহক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এই সময়ে তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্র ছিল করপোরেট ঋণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, বড় বিনিয়োগ প্রকল্পে অর্থায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহক ব্যবস্থাপনা। ফলে ব্যাংকিংয়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা—ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি দক্ষতা অর্জন করেন।
ব্র্যাক ব্যাংকে দ্রুত উত্থান
২০১৭ সালে তারেক রেফাত উল্লাহ খান ব্র্যাক ব্যাংকে যোগ দেন হেড অব ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট হিসেবে। ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর মান উন্নয়ন, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ক্রেডিট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর।
কর্মদক্ষতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর দায়িত্বের পরিধি বাড়তে থাকে। তিনি পর্যায়ক্রমে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও হেড অব করপোরেট ব্যাংকিং এবং পরে অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও হেড অব করপোরেট অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের বৃহৎ করপোরেট গ্রাহক, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি নেতৃত্ব দেন। করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়োগ
দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালে আসে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলক।
২০২৫ সালের ২৭ মে থেকে তিনি ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি ব্যাংকটির অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন।
একজন বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগ দিয়ে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে পৌঁছানো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে উল্লেখযোগ্য ক্যারিয়ার অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পারিশ্রমিক নিয়ে আলোচনা
ব্র্যাক ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তারেক রেফাত উল্লাহ খানের মাসিক মোট পারিশ্রমিক প্রায় ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
তবে এই অঙ্ককে কেবল মূল বেতন হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। শীর্ষ নির্বাহীদের পারিশ্রমিক বা রেমুনারেশন সাধারণত কয়েকটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এর মধ্যে থাকে মূল বেতন, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা, কর্মদক্ষতাভিত্তিক বোনাস, অবসর সুবিধা, বীমা এবং বিভিন্ন আর্থিক ও অ-আর্থিক সুযোগ-সুবিধা। ফলে প্রকাশিত ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকা তাঁর হাতে পাওয়া নিট মাসিক বেতন—এমনটি বলা যায় না; এটি মোট পারিশ্রমিকের একটি সমন্বিত হিসাব।
তিন দশকের অভিজ্ঞতায় নেতৃত্ব
১৯৯৬ সালে আইএফআইসি ব্যাংকে শুরু হওয়া পেশাজীবন আজ প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। আইএফআইসি, এবি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তিনি করপোরেট ব্যাংকিং, ক্রেডিট রিস্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী থেকে দেশের অন্যতম বড় বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী হয়ে ওঠার গল্পটি মূলত ধারাবাহিক দক্ষতা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত প্রস্তুতির গল্প। আর তাঁর বর্তমান পারিশ্রমিক ও দায়িত্ব—দুটিই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে তাঁর অবস্থানের গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।![]()