কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি হামলায় শস্য পরিবহন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গম, যব ও ভুট্টার সরবরাহে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, এরই মধ্যে বিশ্ব খাদ্যপণ্যের দাম সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
এফএওর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে খাদ্য মূল্যসূচকের গড় মান ছিল ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্ট। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটি সর্বোচ্চ। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে সামরিক সংঘাতের তীব্রতা বাড়ায় শস্য সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে বাজারে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশই বৈশ্বিক শস্যবাজারের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শস্য রপ্তানিকারক। দেশটির গমসহ বিভিন্ন শস্যের বড় অংশ যায় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বাজারে। তুরস্ক ও মিসর এর বড় ক্রেতা। অন্যদিকে শস্য রপ্তানিতে ইউক্রেনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনের ওপর দুই দেশের রপ্তানি কার্যক্রমের বড় অংশ নির্ভরশীল। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের হিসাবে, রাশিয়ার সমুদ্রপথে শস্য রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি কৃষ্ণসাগরের বন্দর দিয়ে হয়। আরও প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি হয় আজভ সাগর দিয়ে। ফলে এ দুই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে দ্রুত প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষ্ণসাগরে জাহাজ ও বন্দর অবকাঠামোয় হামলা বেড়েছে। জুলাইয়ে ইউক্রেনের একের পর এক ড্রোন হামলার পর রাশিয়া আজভ সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে বিকল্প পথে কিছু খাদ্যশস্য রপ্তানি করা হলেও আগের সক্ষমতায় তা করা সম্ভব হয়নি।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের উদীয়মান বাজারবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ তাতিয়ানা অরলোভার তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়ার শস্য রপ্তানি স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশে নেমে আসে। কাস্পিয়ান, বাল্টিক সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহারের চেষ্টা করা হলেও কৃষ্ণসাগরের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। চলতি বছর দেশটিতে আগাম ও ভালো শস্য উৎপাদন হলেও রপ্তানির ক্ষেত্রে পরিবহন সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনের খাদ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, সমুদ্র, রেল, নদী ও সড়কপথ মিলিয়ে সম্ভাব্য রপ্তানির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ করতে পেরেছে দেশটি।
কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিও দ্রুত বেড়েছে। তুরস্কের নাবিক ইউনিয়ন তুর্কিয়ে দেনিজচিলের সেনদিকাসির হিসাবে, জুলাইয়ে কৃষ্ণসাগরে ৩৫টি জাহাজে হামলা হয়। এসব ঘটনায় ২৩ জন নিহত হন। যুদ্ধ শুরুর পর এক মাসে এত বেশি নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনা আর দেখা যায়নি।
আগস্টেও হামলা অব্যাহত ছিল। রাশিয়া ইউক্রেনের প্রধান শস্য রপ্তানি কেন্দ্র ওদেসা ও চর্নোমর্স্ক বন্দরে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনও ড্রোন ব্যবহার করে রুশ জাহাজ ও বন্দর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর নভোরোসিস্কও এসব হামলার লক্ষ্য হয়েছে। বন্দরটি তেল ও শস্য রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেনের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে রুশ ট্যাংকারও রয়েছে। কিয়েভের দাবি, এসব জাহাজ রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহরের’ অংশ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে সামরিক সংঘাতের প্রভাব বন্দর ও সামরিক স্থাপনার বাইরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
সামুদ্রিক ঝুঁকি বিশ্লেষকেরাও কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ার কথা বলছেন। তাদের মতে, হামলা এখন শুধু বন্দরকেন্দ্রিক নেই; কৃষ্ণসাগরের আরও বিস্তৃত এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের নৌপরিবহন সংস্থা।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পরে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে শস্য রপ্তানির পথ সচল করা হলেও সাম্প্রতিক হামলা আবারও সেই সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বিশ্ববাজারে গমের দাম ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। যদিও ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমান দাম এখনো কম। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহে বিঘ্ন থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে যেসব দেশ গম, যব ও ভুট্টার মতো খাদ্যশস্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরির পেছনে শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত নয়, আরও কয়েকটি কারণ কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা সংকট, ইউরোপের তীব্র গরমে কৃষি উৎপাদনের ওপর প্রভাব এবং আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে খাদ্যের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আগামী বছরেও অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে এবার ২০২২ সালের মতো বড় ধরনের খাদ্যসংকট তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা আশাবাদও রয়েছে। তাতিয়ানা অরলোভার মতে, ২০২২ সালে বড় খাদ্য আমদানিকারক অনেক দেশ আকস্মিক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। এবার অনেক দেশ তুলনামূলকভাবে বেশি শস্য মজুত করে রেখেছে। ফলে সরবরাহে সাময়িক ধাক্কা এলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা আগের চেয়ে ভালো।
তারপরও খাদ্যের দামে প্রভাব পড়বে—এ বিষয়ে খুব বেশি সন্দেহ নেই। কৃষ্ণসাগরে সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি আরও কমতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হয়ে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর খাদ্য ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।