দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব গড়ে তোলার জন্য বড় ধরনের ভৌগোলিক সুবিধা তৈরি করেছে। ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাছাকাছি হওয়ায় ঢাকাকে ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দেশীয় এয়ারলাইনসের সক্ষমতা, ট্রানজিট সুবিধা, জ্বালানি ব্যয়, দক্ষ জনবল ও নীতিগত সংস্কারের ঘাটতি এ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
গত এক দশকে দেশের এভিয়েশন অবকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে সক্ষমতায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তৃতীয় টার্মিনালের মাধ্যমে শাহজালাল বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। আধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা ব্যবস্থার পাশাপাশি টার্মিনাল পরিচালনা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়েও প্রতিযোগিতা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির প্রক্রিয়াও এগিয়েছে।
তবে শুধু বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ালেই বাংলাদেশ আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত হবে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ট্রানজিট ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হতে হবে দেশীয় এয়ারলাইনসকে। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যাত্রী এনে ঢাকায় সংযোগের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোয় পৌঁছে দেয়ার মতো রুট নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য সহজ ট্রানজিট, ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া ছাড়াই নির্দিষ্ট সময় অবস্থানের সুযোগ, সাশ্রয়ী সেবা ও অন-অ্যারাইভাল ভিসার মতো সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, সফল এভিয়েশন হাব গড়ে তোলার মূল দায়িত্ব দেশীয় এয়ারলাইনসের। সরকারের কাজ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা। বিদেশী এয়ারলাইনস বাংলাদেশকে তাদের হাব হিসেবে গড়ে তুলবে না। তাই দেশীয় ক্যারিয়ারগুলোকে উপযুক্ত বহর, বিপণন ও পরিচালন কৌশলের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ থেকে যাত্রী এনে ঢাকায় ট্রানজিট করানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের সম্ভাবনা কেবল যাত্রী পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নয়। তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত মাছ ও তাজা কৃষিপণ্যের মতো পণ্য দ্রুত পরিবহনে এয়ার কার্গোর চাহিদা রয়েছে। আধুনিক কার্গো টার্মিনাল, কোল্ড স্টোরেজ ও সমন্বিত কার্গো ভিলেজ গড়ে তোলা গেলে এয়ার কার্গোকে রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে আরো কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।
পর্যটন খাতেও এভিয়েশনের ভূমিকা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে ১০ হাজার ৭৬৮ ফুটে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারকে সরাসরি আন্তর্জাতিক রুটে যুক্ত করা গেলে বিদেশী পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি দেশের পর্যটন শিল্পেও গতি আসতে পারে। সিলেটের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বিমানবন্দরের আধুনিকায়নও আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর বহরও আগের তুলনায় বড় হয়েছে। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে ১৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২৪টি এবং এয়ার অ্যাস্ট্রার চারটি উড়োজাহাজ রয়েছে। ইউএস-বাংলা ইতোমধ্যে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও ড্রিমলাইনারসহ বিভিন্ন ধরনের উড়োজাহাজ দিয়ে বহর আধুনিকায়ন করেছে।
এ বহর ও আন্তর্জাতিক রুট আরো সম্প্রসারণ করা গেলে ঢাকাকে শুধু যাত্রীদের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী যাত্রীদের একটি অংশকে ঢাকায় স্থানান্তর করতে পারলে বিমানবন্দর ও দেশীয় এয়ারলাইনস—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবসার পরিধি বাড়বে।
এয়ারএশিয়া ও কুয়েত এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্ট টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কেএম মজিবুল হক বলেন, ঢাকা বিমানবন্দরকে সফল এভিয়েশন হাব করতে হলে দক্ষতা, ট্রানজিট সুবিধা ও কৌশলগত নেটওয়ার্কিং বাড়াতে হবে। বর্তমানে একটি উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ডে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগলেও দক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে ন্যারো-বডি উড়োজাহাজে তা ২৮ মিনিট এবং ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজে ৪৮ মিনিটে নামিয়ে আনা সম্ভব। শুধু সরাসরি যাত্রীর ওপর নির্ভর না করে গালফ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ট্রানজিট যাত্রী বাড়াতে হবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের ৭০ শতাংশের বেশি বাজার বিদেশী এয়ারলাইনসের নিয়ন্ত্রণে। এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, সাউদিয়া, এয়ার অ্যারাবিয়া ও ইন্ডিগোর মতো বড় ক্যারিয়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশীয় এয়ারলাইনসকে বহর, মূলধন ও রুট নেটওয়ার্কে আরো শক্তিশালী হতে হবে।
এখানে বড় বাধা হয়ে আছে পরিচালন ব্যয়। একটি এয়ারলাইনসের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি খাতে চলে যেতে পারে। দেশে বিমান জ্বালানি সরবরাহে একক নিয়ন্ত্রণ, কর ও সারচার্জসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির দাম তুলনামূলক বেশি। ফলে দেশীয় ক্যারিয়ারগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাড়তি চাপের মুখে পড়ে। এর সঙ্গে ডলারের সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন যুক্ত হয়েছে। উড়োজাহাজ লিজ, যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেবার মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হওয়ায় পরিচালন ব্যয় আরো বাড়ছে।
দক্ষ পাইলট, প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতিও খাতটির অন্যতম সমস্যা। দেশে মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল বা এমআরও সুবিধা গড়ে তোলা গেলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বিদেশে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশও দেশে রাখা সম্ভব হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এভিয়েশন হাবের জন্য নীতিগত সংস্কারও জরুরি। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রক ও অপারেটর ভূমিকা পৃথক করা, দেশে এমআরও সুবিধা গড়ে তোলা এবং দেশীয় এয়ারলাইনসকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও কর সুবিধা দেয়ার মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ঢাকার বিমানবন্দরের রানওয়ে ও পার্কিং সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক অপারেশন ও স্লট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যমান সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ রুটের উড়োজাহাজগুলো রাতে ঢাকার পরিবর্তে চট্টগ্রাম বা সিলেটে রাখলে পার্কিংয়ের চাপ কমানো সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রয়োজন হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে আঞ্চলিক হাব হওয়ার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। তৃতীয় টার্মিনাল যাত্রী ও কার্গো সক্ষমতা বাড়াবে, কক্সবাজারের সম্প্রসারিত রানওয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটনের সুযোগ বাড়াবে এবং দেশীয় এয়ারলাইনসের বহর ও আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ ট্রানজিট ব্যবসার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে এসব অবকাঠামোকে কার্যকর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হলে দেশীয় ক্যারিয়ারকে শক্তিশালী করা, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং দ্রুত নীতিগত সংস্কার করা জরুরি।