নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের চাপ এবার নিম্ন আয়ের মানুষের প্রাণিজ আমিষের খাবারেও পড়েছে। তুলনামূলক কম দামের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নিম্নবিত্ত পরিবারের খাদ্যতালিকায় থাকা ডিম, পাঙাশ, তেলাপিয়া ও ব্রয়লার মুরগির দামও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। ফলে সংসারের ব্যয় সামলাতে অনেক পরিবার এসব খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ফার্মের লাল ডিম প্রতি ডজন ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে প্রতি হালি ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০ থেকে ৩০০ টাকা, ছোট পাঙাশ ২০০ থেকে ২৪০ টাকা এবং বড় পাঙাশ ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটেও পণ্যগুলোর দাম কাছাকাছি ছিল।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জাতীয় বাজারদরের তথ্যেও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এসব পণ্যের দাম বাড়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। আগস্টে সারা দেশে ছোট পাঙাশের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৮৩ টাকা এবং বড় পাঙাশের ২৫১ টাকা। জুলাইয়ে এ দুটি মাছের গড় দাম ছিল যথাক্রমে ১৮১ ও ২৫০ টাকা। জুনে ছিল ১৭৮ ও ২৪৭ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে দুই ধরনের পাঙাশের গড় দামই বেড়েছে।
ব্রয়লার মুরগির দাম বৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য। আগস্টে এর জাতীয় গড় দাম দাঁড়িয়েছে কেজিপ্রতি ১৮৪ টাকা, যা জুলাইয়ে ছিল ১৭৫ টাকা। এক মাসেই কেজিপ্রতি গড় দাম বেড়েছে ৯ টাকা। জুনে ব্রয়লারের জাতীয় গড় দাম ছিল ১৬৭ টাকা। একই সময়ে ফার্মের লাল ডিমের জাতীয় গড় দাম আগস্টে প্রতি হালি ৪৮ টাকা, যা জুলাইয়ে ৪৩ এবং জুনে ৪২ টাকা ছিল।
তেলাপিয়ার দামও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। আগস্টে সারা দেশে এ মাছের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ২০৬ টাকা। জুলাইয়ে ছিল ২০২ টাকা এবং জুন ও মে মাসে ১৯৯ টাকা। সিলভার কার্পের গড় দামও আগস্টে বেড়ে ২১০ টাকা হয়েছে; জুলাইয়ে যা ছিল ২০৮ এবং জুনে ২০৫ টাকা।
দাম বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্যাভ্যাসে। রাজধানীর মগবাজারে পরিবার নিয়ে বসবাসকারী রিকশাচালক আজিজুর রহমান জানান, আয় দিয়ে গাড়ির জমা, বাসাভাড়া ও সংসারের অন্যান্য খরচ মেটানোর পর খাবারের ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে পরিবারের অন্তত এক বেলায় মাছ বা ডিম থাকলেও এখন সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তিনি ও তাঁর স্ত্রী এসব খাবার প্রায় বাদ দিয়েছেন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বাজার করতে আসা নিম্ন আয়ের অন্য ক্রেতারাও। তাদের ভাষ্য, গরু বা খাসির মাংস অনেক আগেই নাগালের বাইরে চলে গেছে। তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ব্রয়লার মুরগি, পাঙাশ কিংবা তেলাপিয়া দিয়ে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটানো হতো। এখন এসব পণ্যের দামও বাড়ায় সেই বিকল্পটিও সংকুচিত হচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য বাড়লেও নিম্ন আয়ের মানুষের আয় একই হারে না বাড়ায় খাদ্য ব্যয় কমাতে গিয়ে অনেকেই মাছ, ডিম ও মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন পুষ্টিবিদরা।
পুষ্টিবিদ ডা. নিশাত শারমিন নিশির মতে, পাঙাশসহ মাছ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের উৎস। শরীরের বৃদ্ধি ও গঠন, ক্ষত নিরাময়, পেশির শক্তি, হরমোন তৈরি এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখতে প্রোটিন প্রয়োজন। তুলনামূলক কম দামের কারণে পাঙাশ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমিষের উৎস হওয়ায় এর দাম বাড়লে তাদের প্রোটিন গ্রহণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজারের বর্তমান চিত্র বলছে, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য প্রাণিজ আমিষের সাশ্রয়ী বিকল্পগুলোও ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। আয় ও খাদ্যপণ্যের দামের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকলে পরিবারের পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।![]()