বাংলা চলচ্চিত্রে দুই শতাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির উদ্যোগে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) আয়োজিত ‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে’ অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।
সম্মাননা গ্রহণের পর ফরিদুর রেজা সাগর চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, এভাবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত সবাই একত্রিত থাকলে দেশের চলচ্চিত্র আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
দুই শতাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজনার পাশাপাশি দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আয়োজকেরা ফরিদুর রেজা সাগরকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আই দীর্ঘ সময় ধরে দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখে আসছে বলে অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।![]()
এদিনের আয়োজন শুধু সম্মাননা প্রদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সময়ে অবদান রাখা প্রবীণ ও গুণী নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী, প্রযোজকসহ সংশ্লিষ্টদের একত্রিত করার মধ্য দিয়ে এটি হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র অঙ্গনের একটি মিলনমেলা। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পুরোনো ও অভিজ্ঞ নির্মাতাদের যোগাযোগ বাড়ানো এবং তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়াই ছিল আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা পেয়েছেন পরিচালক কাজী হায়াত, সোহেল রানা, মতিন রহমান, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, আবু মুসা দেবু, মহিউদ্দিন শাকের, আবুল খায়ের বুলবুল ও আওকাত হোসেন। কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনকেও দেওয়া হয় সম্মাননা। আমন্ত্রিত অতিথিরা গুণীজনদের হাতে এসব সম্মাননা তুলে দেন।
আজীবন সদস্য সম্মাননা পাওয়ার পর নিজের অনুভূতিও প্রকাশ করেন কিংবদন্তি অভিনেতা, নির্মাতা ও প্রযোজক সোহেল রানা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করে তিনি জানান, জীবনে কিছু কিছু পুরস্কার এখনো তাঁকে বিশেষভাবে আনন্দিত করে। চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকে পাওয়া আজীবন সদস্য সম্মাননাকে তিনি তাঁর জীবনের একটি বড় স্মৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন।![]()
তবে সম্মাননার চেয়েও বর্তমান পরিচালক সমিতির উদ্যোগের ধরন তাঁকে বেশি মুগ্ধ করেছে বলে জানান সোহেল রানা। তিনি নিজেও দুইবার চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, দায়িত্ব পালনকালে এমন একটি আয়োজনের চিন্তা তাঁর মাথায় আসেনি।
সোহেল রানা বলেন, সারা বছরে একটি দিন চলচ্চিত্রের সব পরিচালককে নিয়ে আনন্দ করার উদ্যোগটি তাঁকে মুগ্ধ করেছে। ভুরিভোজ, র্যালি, গান-বাজনার পাশাপাশি নতুন ও পুরোনো পরিচালকদের অনেকের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সবাই মিলে ভাইয়ের মতো আড্ডা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এত সুন্দর একটি ভাবনা আগে তাঁর মাথায় আসেনি বলেও আক্ষেপের সুরে উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান সমিতির কর্মকর্তাসহ আয়োজনে যুক্ত সব পরিচালককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান সোহেল রানা। তথ্য মন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীসহ বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতিরও প্রশংসা করেন তিনি।![]()
একই সঙ্গে ফরিদুর রেজা সাগর, সাবিনা ইয়াসমিনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা গুণীজনদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মান জানানোর বিষয়টিকেও ইতিবাচকভাবে দেখেন সোহেল রানা। চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক সভাপতি হিসেবে বর্তমান কমিটির এ উদ্যোগে তিনি গর্বিত বলেও জানান।
সোহেল রানা বলেন, সমিতির সদস্য হিসেবে বর্তমান ও সাবেক সবাই এই উদ্যোগের সঙ্গে গর্বের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। তিনি বর্তমান কমিটি ও সাধারণ সদস্যদের জন্য শুভকামনা জানিয়ে দৃঢ় মনোবল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আয়োজনের উদ্দেশ্য তুলে ধরে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেক চলচ্চিত্রকর্মীর সঙ্গে অতীতের বহু গুণী পরিচালকের যোগাযোগ নেই। অথচ এসব নির্মাতার কাজ দেশের চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানাতেই এ সম্মাননা আয়োজন করা হয়েছে।
সমিতির মহাসচিব শাহীন কবির টুটুল বলেন, দেশের চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করা অনেক গুণী ব্যক্তি হয়তো জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, আবার অনেকেই পাননি। পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকে তাঁদের সম্মান জানানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই এ আয়োজন। প্রতি বছর ৩ আগস্ট ‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে’ পালনের চেষ্টা থাকবে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই দিনে ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পেয়েছিল।![]()
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ বাংলাদেশের পুরোনো চলচ্চিত্রের প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগের সময়ের সিনেমা মানুষ শুধু দেখত না, অনেক চলচ্চিত্র দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘদিন থেকে যেত। সিনেমার মধ্য দিয়ে ইতিবাচক নানা বার্তাও মানুষের মধ্যে পৌঁছে যেত।
আগামী দিনে সম্মিলিতভাবে এমন চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করা হবে, যেগুলো দেশের মানুষের কথা বলবে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে চলচ্চিত্রকে দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা উঠে আসে।
তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশের সিনেমার উন্নয়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চেয়েছেন। সিনেমা ও এফডিসির উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেগুলো খুব শিগগিরই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি নিজের ব্যক্তিগত আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, নিজেও একসময় চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। ফলে চলচ্চিত্র ও এফডিসির উন্নয়নের বিষয়টি তাঁর কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।![]()
অনুষ্ঠানে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীসহ চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। দিনের আয়োজনজুড়ে ছিল পুরোনো ও নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকর্মীদের মিলন, স্মৃতিচারণ ও পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ।
সাংস্কৃতিক পর্বে নৃত্য পরিবেশন করেন চিত্রনায়িকা দিঘী। গান পরিবেশন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী কোনাল। তাঁদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠানে যোগ হয় ভিন্ন মাত্রা।
‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে’ উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন চলচ্চিত্রের গুণীজনদের দীর্ঘদিনের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকর্মীদের একই ছাদের নিচে নিয়ে আসার একটি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সম্মাননা, পুনর্মিলন ও সাংস্কৃতিক আয়োজন মিলিয়ে এফডিসির অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র অঙ্গনের একটি ব্যতিক্রমী মিলনমেলা।
![]()