প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০৫
বিশেষ প্রতিবেদক:
অতীতে একটি নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা দিতে নেওয়া নীতি এবং অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কারণেই দেশে বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অতীতে জ্বালানি খাতে যেসব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অনেকটাই ছিল অপরিকল্পিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে নীতিও গ্রহণ করা হয়েছিল। এখন সেই সিদ্ধান্তগুলোর খেসারত দেশের মানুষ ও বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে জাতীয় সংসদের এলডি হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন, ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাতে সংকট ছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে সচল ও ঘুরে দাঁড় করাতে সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে, আমরা একটি ধ্বংসস্তূপ পেয়েছি বলা যায়। আমরা পেয়েছি এক দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন, ভঙ্গুর শিক্ষা বা ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। সেই অবস্থা থেকে সরকার চেষ্টা করছে সমগ্র দেশকে সফলভাবে ঘুরে যাতে দাঁড় করাতে পারে।’
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকটের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষ যে দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে, সরকার তা অস্বীকার করছে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে মানুষের কষ্টের বিষয়টি সরকার জানে। তবে দীর্ঘদিন ধরে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে তৈরি হওয়া সংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘সরকার কিন্তু একবারও অস্বীকার করেনি যে বহু মানুষ এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক কষ্ট ভোগ করছে। আমরা জানি এটি। তবে আমি মাত্রই উল্লেখ করেছি, আমরা সামগ্রিকভাবে একটি ভঙ্গুর অবস্থা বা ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি।’
জ্বালানি খাতে অতীতের পরিকল্পনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, গ্যাস, জ্বালানি ও পেট্রোলসহ পুরো জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলোই যথাযথ পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। আবার কোনো কোনো নীতি নির্দিষ্ট একটি মহলকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেও নেওয়া হয়েছিল।
তারেক রহমান বলেন, ‘গ্যাস বা জ্বালানি বা পেট্রোল, সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খাতে যেই অপরিকল্পিতভাবে প্ল্যান-প্রোগ্রামগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল অথবা বিগত দিনগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য যেসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তার খেসারত সমগ্র দেশ, দেশের মানুষ এবং বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, অতীতের এসব অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে জ্বালানি খাত এমন একটি অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারকে একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হচ্ছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, অতীতে নেওয়া পরিকল্পনাগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা এবং জ্বালানি খাতকে একটি টেকসই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেজন্যই আমরা এর মধ্যেও কাজ শুরু করেছি। এই যে অপরিকল্পিত প্ল্যান যেগুলো ছিল, যা আমাদের জ্বালানি খাতকে একটি বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে, কীভাবে সেটিকে সঠিক করে নিয়ে আসতে পারি আমরা? কীভাবে এমন একটি পরিকল্পনা আমরা উপস্থাপন করতে পারি, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই পেট্রোল বলুন, গ্যাস বলুন বা সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খাত বলুন, এর থেকে দেশ এবং দেশের মানুষকে ধীরে ধীরে আমরা সংকট থেকে বের করতে পারি।’
একই সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানোর অভিযোগও করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শাসন ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে অতীতের সুবিধাভোগীরা এখনো সক্রিয়। তাদের একটি অংশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার জন্য সুকৌশলে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র, রাজনীতি, শাসন-প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা কিন্তু বসে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে একটি চক্র খুব সুকৌশলে জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ সেক্টরকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয়। তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য উপস্থাপন করছে।’
সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে দেশকে ধীরে ধীরে বের করে এনে জনগণের জন্য স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
চিকিৎসাসেবা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুত ই-হেলথ কার্ড চালুর কাজ শুরু করা হবে। একই সঙ্গে উপজেলা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সেগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, প্রয়োজনীয় জনবলও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য স্বাস্থ্য খাতে নতুন জনবল নিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ই-হেলথ কার্ড চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, এর কাজ যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা হবে। এর মাধ্যমে একজন নাগরিকের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে সরকার মনে করছে।
শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমাজের প্রায় সব কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবীরা নিজ নিজ রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুযায়ী সচেতনভাবে সংগঠিত থাকতে পারেন। এটিকে অযৌক্তিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে যেন পেশাগত দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সব কাজকেই প্রভাবিত করে, সেহেতু শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী—সবাই যার যার মতাদর্শ অনুযায়ী সচেতনভাবে সুসংগঠিত থাকবেন। এটা কোনো অযৌক্তিক বিষয় নয়। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটায় বা বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়, সেটি হচ্ছে মোস্ট ইম্পর্টেন্ট।’
প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি খাতেই এখন পরিবর্তনের দাবি রয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে রাজনীতির ধরন ও কার্যক্রমে গুণগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন খুব সম্ভবত প্রতিটি সেক্টরে সামগ্রিকভাবে সমগ্র বাংলাদেশে এখন খুব স্ট্রং ডিমান্ড। এটা আমরা সকলেই সেটা অনুভব করতে পারি। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে।’
চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করতে সরকার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য সেবা সহজ করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান সংকট শুধু একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেই দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে একই সঙ্গে সংস্কার, পুনর্গঠন ও উন্নয়নের কাজ করতে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর টেকসই সমাধান করা। এ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতের ভুল ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত সংশোধন করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি না হয়। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা নিতে হবে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নীতিগত ও পরিকল্পনাগত দুর্বলতা রয়েছে। সেই সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ শুরু করেছে। তবে এর সুফল পেতে সময় লাগবে। সরকার ধীরে ধীরে জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করে জনগণকে সংকট থেকে বের করে আনার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘কীভাবে এমন একটি পরিকল্পনা আমরা উপস্থাপন করতে পারি, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই পেট্রোল বলুন, গ্যাস বলুন বা সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খাত বলুন, এর থেকে দেশ এবং দেশের মানুষকে ধীরে ধীরে আমরা সংকট থেকে বের করতে পারি, বের করে নিয়ে আসতে পারি।’
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে অতীতের অপরিকল্পিত জ্বালানি নীতি ও নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনার পাশাপাশি বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিসরে জনবল নিয়োগ, উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।