শুক্রবার, অক্টোবর ৯, ২০২৬
  • হোম
  • বিশ্ব
  • বাংলাদেশ
  • যুক্তরাষ্ট্র
  • নিউইয়র্ক
  • বিশ্ব
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • খেলা
  • চাকরি
  • মতামত
  • অন্যান্য
No Result
View All Result
No Result
View All Result
  • হোম
  • বিশ্ব
  • বাংলাদেশ
  • যুক্তরাষ্ট্র
  • নিউইয়র্ক
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • খেলা
  • চাকরি
  • মতামত
  • অন্যান্য
প্রচ্ছদ আন্তর্জাতিক

অ্যান কারসন: পুরাণ, প্রেম ও শোকের ভেতর দিয়ে সাহিত্যের নতুন ভাষা

ইউএসএ বাংলা ডেস্ক - ইউএসএ বাংলা ডেস্ক
৯ অক্টোবর ২০২৬
in আন্তর্জাতিক, বিশ্ব, যুক্তরাষ্ট্র, সাহিত্য
Reading Time: 1 min read
A A
0
অ্যান কারসন: পুরাণ, প্রেম ও শোকের ভেতর দিয়ে সাহিত্যের নতুন ভাষা

কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ কিংবা উপন্যাস—সাহিত্যের কোনো একটি পরিচয়ে অ্যান কারসনকে বেঁধে রাখা কঠিন। প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্র তাঁর লেখায় ফিরে আসে আধুনিক মানুষের প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও আকাঙ্ক্ষার গল্প হয়ে। কখনো কবিতার ভেতর ঢুকে পড়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, কখনো ইতিহাসের বহু পুরোনো কোনো চরিত্র কথা বলতে শুরু করে আজকের মানুষের ভাষায়। সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ভেঙে এমন স্বতন্ত্র এক জগৎ নির্মাণ করেছেন কানাডীয় এই কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক।

সেই ব্যতিক্রমী সাহিত্যভুবনের স্বীকৃতি হিসেবেই ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন অ্যান কারসন—যাঁর লেখায় প্রাচীন গ্রিসের জ্ঞান ও কল্পনা সমকালীন মানুষের জটিল অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায়। তাঁর সাহিত্য পাঠককে শুধু গল্পের ভেতরে নিয়ে যায় না, বরং গল্প বলার প্রচলিত পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। প্রেমের গল্প বলতে গিয়ে তিনি অনুসন্ধান করেন আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি, পুরাণের চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে তুলে আনেন মানুষের ভঙ্গুরতা, আর ব্যক্তিগত শোকের বিবরণে খুঁজে ফেরেন স্মৃতি ও সময়ের সম্পর্ক।

কারসনের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য এখানেই। তিনি প্রাচীন সাহিত্যকে কেবল অতীতের নিদর্শন হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে ধ্রুপদি সাহিত্য এমন এক জীবন্ত জগৎ, যেখানে বর্তমানের মানুষের প্রশ্ন, দ্বন্দ্ব ও অনুভূতির সঙ্গে কথোপকথন চালানো যায়। সেই কথোপকথনে কখনো হাস্যরস থাকে, কখনো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, আবার কখনো এমন এক নীরব বেদনা, যা পাঠ শেষ হওয়ার পরও থেকে যায়।

Canadian poet Anne Carson performs her work “Antigonick” at the Moderna Museet art gallery in Stockholm, Sweden, in this file photograph dated May 8, 2015. TT News Agency/Pontus Lundahl via REUTERS ATTENTION EDITORS – THIS IMAGE WAS PROVIDED BY A THIRD PARTY. SWEDEN OUT. NO COMMERCIAL OR EDITORIAL SALES IN SWEDEN.

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর সুইডিশ একাডেমি তাঁর নাম ঘোষণা করে। একাডেমির ভাষ্যে, ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌতুকপূর্ণ সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন নতুন রূপ সৃষ্টি করা তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। পুরস্কার ঘোষণার সময় ৭৬ বছর বয়সী কারসন ছিলেন আইসল্যান্ডে। সুইডিশ একাডেমির পার্মানেন্ট সেক্রেটারি ইনগ্রিড কার্লবার্গ জানান, তাঁকে খবরটি দেওয়ার সময় তিনি আইসল্যান্ডে বাতাসের শব্দ শুনছিলেন।

এই দৃশ্যের সঙ্গে কারসনের সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর রচনায় বাইরের জগতের সামান্য কোনো অনুষঙ্গও কখনো স্মৃতি, অনুভূতি কিংবা গভীর চিন্তার দরজা খুলে দেয়। তবে তাঁর লেখার শক্তি শুধু বিষয়বৈচিত্র্যে নয়; ভাষা, আঙ্গিক ও চিন্তার মধ্যে অপ্রত্যাশিত সংযোগ তৈরি করার ক্ষমতাই তাঁকে সমকালীন সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠে পরিণত করেছে।

গ্রিক ভাষার প্রতি আকর্ষণ, যে পথ খুলে দিয়েছিল সাহিত্যের দরজা

অ্যান প্যাট্রিসিয়া কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোয়। শৈশব ও কৈশোরের বড় অংশ কেটেছে কানাডার বিভিন্ন ছোট শহরে। পরবর্তী জীবনে তিনি যে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের গভীরে প্রবেশ করবেন, তার সূচনা হয়েছিল স্কুলজীবনের এক শিক্ষকের হাত ধরে।

হাইস্কুলে পড়ার সময় লাতিন ভাষার এক শিক্ষক তাঁকে প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখাতে শুরু করেন। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে চলত সেই পাঠ। ভাষা শেখার এই অনানুষ্ঠানিক আয়োজন একসময় কারসনের সামনে খুলে দেয় গ্রিক কবিতা, নাটক, পুরাণ ও দর্শনের বিস্তৃত জগৎ। প্রাচীন সাহিত্য তাঁর কাছে কেবল পরীক্ষায় শেখার বিষয় ছিল না; হয়ে উঠেছিল মানুষের মন, আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতা বোঝার একটি পথ।

গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার একটি দ্বিভাষিক সংস্করণ হাতে পাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর সাহিত্যিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বইটির এক পাশে মূল গ্রিক পাঠ, অন্য পাশে অনুবাদ। ভাষাটি তখনো তাঁর কাছে পুরোপুরি সহজবোধ্য ছিল না। কিন্তু গ্রিক অক্ষরের দৃশ্যমান সৌন্দর্য এবং ভাষার গঠন তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। শব্দের অর্থ বোঝার আগেই ভাষার নিজস্ব অবয়ব তাঁকে টেনেছিল—কারসনের পরবর্তী সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে এই অভিজ্ঞতার তাৎপর্য অনুভব করা যায়। তাঁর কাছে ভাষা কেবল বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম নয়; ভাষার বিন্যাস, ছন্দ, বিরতি ও দৃশ্যমান গঠনও অর্থ নির্মাণের অংশ।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট মাইকেলস কলেজে পড়াশোনা করে ১৯৭৪ সালে স্নাতক এবং ১৯৭৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন কারসন। ১৯৮১ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্রুপদি সাহিত্যে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়েও এক বছর গ্রিক ছন্দ নিয়ে পড়াশোনা করেন।

এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবন তাঁর লেখায় বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য তৈরি করে। তিনি প্রাচীন সাহিত্যকে উদ্ধৃত করেন, তার অনুবাদ করেন, কখনো ব্যাখ্যা করেন, আবার কখনো সেই সাহিত্যের কোনো চরিত্র বা কাহিনিকে সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতিতে স্থাপন করেন। গবেষকের বিশ্লেষণী দৃষ্টি এবং কবির কল্পনাশক্তি তাঁর কাজে পাশাপাশি চলে। ফলে তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে পাঠককে একদিকে সাহিত্যিক আবিষ্কারের আনন্দ নিতে হয়, অন্যদিকে পরিচিত ধারণা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়।

প্রেমের দর্শন থেকে মানুষের আকাঙ্ক্ষার পাঠ

কারসনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর একটি ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট: অ্যান এসে’। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বইটি প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লেখা সাধারণ কোনো কাব্যিক নিবন্ধ নয়। প্রাচীন গ্রিক কবিতা ও দর্শনের আলোকে তিনি অনুসন্ধান করেছেন মানুষের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে জন্ম নেয়, অনুপস্থিতি কীভাবে আকর্ষণকে তীব্র করে এবং প্রেমের সঙ্গে অপূর্ণতার সম্পর্ক কোথায়।

প্রেমের ক্ষেত্রে মানুষ কেবল যা পেয়েছে, তার দ্বারাই পরিচালিত হয় না; যা পায়নি, যা হারিয়েছে কিংবা যা নাগালের বাইরে রয়ে গেছে, তা-ও তার অনুভূতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কারসনের সাহিত্যিক অনুসন্ধানে এই অনুপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আকাঙ্ক্ষা তাঁর কাছে নিছক কোনো কিছুকে পাওয়ার ইচ্ছা নয়; এর মধ্যে রয়েছে দূরত্ব, অভাব, কল্পনা এবং নিজের অজানা অংশের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা।

এই আলোচনার জন্য তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতাসহ ধ্রুপদি সাহিত্যের নানা উপাদান ব্যবহার করেছেন। তাঁর গবেষণাধর্মী লেখার বৈশিষ্ট্য হলো, তাত্ত্বিক আলোচনা কখনো শুষ্ক ব্যাখ্যায় আটকে থাকে না। যুক্তি, কবিতা ও ব্যক্তিগত অনুভবের মধ্যে চলতে থাকে এক ধরনের আদান-প্রদান। বইটি তাঁকে ধ্রুপদি সাহিত্য গবেষণার পরিসরের বাইরে বৃহত্তর সাহিত্যজগতেও পরিচিত করে তোলে।

কারসনের কাছে প্রেম তাই শুধু আবেগের বিষয় নয়, চিন্তারও বিষয়। মানুষ কেন অন্য একজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়, ভালোবাসার মধ্যে কেন অনিশ্চয়তা থাকে, বিচ্ছেদ কেন কখনো সম্পর্কের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে—এ ধরনের প্রশ্ন তাঁর নানা রচনায় বিভিন্ন আঙ্গিকে ফিরে আসে। উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্নটির ভেতর প্রবেশ করাই যেন তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই তাঁর লেখায় বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান ও মানবিক অনুভূতি আলাদা হয়ে থাকে না। গ্রিক সাহিত্য নিয়ে গভীর জ্ঞান তাঁর কবিতাকে গবেষণাপত্রে পরিণত করেনি; বরং সেই জ্ঞানকে ব্যবহার করে তিনি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নতুন ভাষা খুঁজেছেন।

‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’: পুরাণের চরিত্র যখন হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষ

Autobiography of Red by Anne Carson: 9780375701290 | PenguinRandomHouse.com: Books

অ্যান কারসনের সাহিত্যিক পরিচয়ের কথা উঠলে যে বইটির নাম বিশেষভাবে সামনে আসে, সেটি ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এ গ্রন্থকে একদিকে কবিতার উপন্যাস, অন্যদিকে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দীর্ঘ কবিতা বলা যায়। প্রচলিত সাহিত্যিক শ্রেণিবিভাগ দিয়ে বইটিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন। আর সেই কঠিন কাজটিই বইটির অন্যতম আকর্ষণ।

বইটির ভিত্তি প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের গেরিয়নকে নিয়ে রচিত পুরাণকাহিনি। মূল কাহিনিতে গেরিয়ন লাল ডানাওয়ালা এক দানব। হেরাক্লিসের অভিযানের অংশ হিসেবে সে নিহত হয়। প্রাচীন কাহিনিতে গেরিয়নের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার দানবীয় সত্তা ও পরিণতির মধ্য দিয়ে। কারসন সেই পরিচয়কে নতুন করে নির্মাণ করেন।

তাঁর রচনায় গেরিয়ন আধুনিক সময়ের এক সংবেদনশীল তরুণ। তার শরীরে লাল ডানা রয়েছে, কিন্তু তার ভেতরের জগৎ মানুষের মতোই জটিল। শৈশবের অসহায়তা, পরিবারের অভিজ্ঞতা, নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধা, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রত্যাখ্যানের বেদনা তাকে তাড়িত করে। সে ছবি তোলে, নিজের অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে চায় এবং নিজের জীবনকে বোঝার চেষ্টা করে।

অন্যদিকে হেরাক্লিসও এখানে কেবল পুরাণের বীর নন। তিনি আধুনিক সময়ের এক আকর্ষণীয়, কিছুটা বেপরোয়া তরুণ। গেরিয়নের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়, আসে প্রেম ও ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু দুই মানুষের অনুভূতি এক রকম থাকে না। যে ভালোবাসা গেরিয়নের কাছে গভীর ও সর্বগ্রাসী, হেরাক্লিসের কাছে তা একই মাত্রায় স্থায়ী হয় না। সম্পর্কের ভেতর জন্ম নেয় অসমতা, আর সেই অসমতা শেষ পর্যন্ত গেরিয়নের হৃদয়ভাঙার অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

এখানে কারসনের বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি পুরাণের কাহিনিকে আধুনিক পোশাক পরিয়ে থেমে থাকেননি। তিনি কাহিনির আবেগগত কেন্দ্রটিই বদলে দিয়েছেন। প্রাচীন গল্পে যে চরিত্রকে দানব হিসেবে দেখা হয়, তাঁর রচনায় সেই চরিত্রের ভেতরের মানুষটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আর যে বীরকে ঘিরে পুরাণের মহিমা, তার মধ্যেও প্রকাশ পায় সম্পর্কের অনিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা।

গেরিয়নের লাল ডানা তার অস্বাভাবিকতার চিহ্ন হলেও সেটিই তার পরিচয়ের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। সে ভালোবাসে, কষ্ট পায়, স্মৃতি ধরে রাখতে চায় এবং নিজের অস্তিত্বকে ভাষায় প্রকাশ করতে চায়। তার অস্বাভাবিক শরীরের আড়ালে যে মানবিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, কারসন পাঠককে সেদিকেই তাকাতে শেখান।

এই উপন্যাসে ফটোগ্রাফির উপস্থিতিও তাৎপর্যপূর্ণ। ছবি তোলার মাধ্যমে গেরিয়ন মুহূর্তকে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু ছবি যেমন কোনো ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য ধারণ করতে পারে না, তেমনি স্মৃতিও জীবনের সব অভিজ্ঞতাকে অক্ষত রাখতে পারে না। প্রেমের মানুষটি চলে যেতে পারে, সম্পর্ক বদলে যেতে পারে; থেকে যায় কিছু দৃশ্য, কিছু অনুভূতি এবং সেগুলোকে বোঝার অসমাপ্ত চেষ্টা।

কারসনের রচনায় এই অসমাপ্তির মূল্য রয়েছে। জীবনকে একটি সুশৃঙ্খল কাহিনিতে পরিণত করার বদলে তিনি তার অসংলগ্নতা, ভাঙন ও অনিশ্চয়তাকে জায়গা দেন। ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ তাই শুধু পুরাণের পুনর্লিখন নয়; পরিচয়, প্রেম, স্মৃতি ও সৃষ্টিশীলতার এক স্বতন্ত্র অনুসন্ধান।

২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘রেড ডক’ বইয়ে তিনি গেরিয়নের গল্পে আবার ফিরে আসেন। পুরোনো চরিত্রকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে কারসন দেখিয়েছেন, কোনো গল্প একবার বলা হয়ে গেলেই তার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। সময়ের পরিবর্তনে একই চরিত্র ও অভিজ্ঞতার ভেতর নতুন অর্থ আবিষ্কার করা সম্ভব।

দাম্পত্য, বিশ্বাসভঙ্গ ও হৃদয়ের জটিলতা

কারসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড: আ ফিকশনাল এসে ইন ২৯ ট্যাঙ্গোস’। ২০০১ সালে প্রকাশিত বইটি দাম্পত্য, আকর্ষণ, অবিশ্বস্ততা ও সম্পর্কের ভাঙন নিয়ে লেখা। বইটির নামের মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের দ্বন্দ্ব। স্বামীর সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয়তার সঙ্গে দাম্পত্যের যন্ত্রণা কীভাবে পাশাপাশি থাকতে পারে, সেই প্রশ্নই রচনাটির অন্যতম কেন্দ্র।

এখানে তিনি প্রচলিত উপন্যাসের কাঠামো অনুসরণ করেননি। বইটি সাজানো হয়েছে ২৯টি ট্যাঙ্গোর মতো অংশে। নাচের ছন্দ যেমন সামনে এগোয়, আবার ফিরে আসে, তেমনি সম্পর্কের স্মৃতি ও অনুভূতিও এখানে সরলরেখায় এগোয় না। পুরোনো অভিজ্ঞতা নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে; আকর্ষণের স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায় হতাশা, আর ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা।

কারসনের এই রচনার বিশেষত্ব হলো, তিনি সম্পর্কের অভিজ্ঞতাকে সহজ নৈতিক সিদ্ধান্তে নামিয়ে আনেন না। বিশ্বাসভঙ্গকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখিয়ে কিংবা ভালোবাসাকে নিখাদ মহিমায় তুলে ধরে তিনি থেমে থাকেন না। বরং অনুসন্ধান করেন, একজন মানুষ অন্যজনের প্রতি আকৃষ্ট থেকেও কীভাবে তার দ্বারা আহত হতে পারেন; কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও তার আকর্ষণ কেন স্মৃতি থেকে মুছে যায় না।

বইটির জন্য ২০০২ সালে তিনি টি এস এলিয়ট পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কারটি তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। এর আগে ২০০০ সালে পেয়েছিলেন ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ, যা যুক্তরাষ্ট্রে সৃজনশীলতা ও গবেষণার ক্ষেত্রে অসাধারণ সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদের দেওয়া সম্মাননা হিসেবে পরিচিত।

কারসনের কবিতায় প্রেমের সঙ্গে বেদনার সম্পর্ক বারবার ফিরে আসে। কিন্তু তাঁর কাছে বেদনা কেবল দুঃখের বিবরণ নয়। কোনো অভিজ্ঞতা মানুষকে কীভাবে বদলে দেয়, স্মৃতি কীভাবে বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিজের অনুভূতি বোঝার জন্য মানুষকে কেন বারবার অতীতের কাছে ফিরতে হয়—এসব প্রশ্ন তাঁর রচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাঁর সাহিত্য পাঠকের কাছে সহজ সান্ত্বনা হাজির করে না। বরং এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেগুলোর কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নেই। সম্পর্কের মধ্যে যেমন আকর্ষণ ও বিরোধ পাশাপাশি থাকতে পারে, তেমনি মানুষের স্মৃতিতেও ভালোবাসা ও ক্ষোভ একই সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে। এই জটিলতাকে অক্ষুণ্ন রাখার মধ্যেই কারসনের লেখার শক্তি।

কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটকের সীমানা ভাঙার শিল্প

অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি বিভিন্ন ঘরানার মধ্যে অনায়াসে চলাচল করেন। তাঁর কোনো বইয়ে কবিতা ও প্রবন্ধ পাশাপাশি থাকে, কোথাও নাটকের সংলাপের সঙ্গে মিশে যায় দার্শনিক আলোচনা। আবার কোনো রচনায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের অনুবাদই হয়ে ওঠে নতুন সাহিত্য সৃষ্টির ভিত্তি।

‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’, ‘প্লেইনওয়াটার’, ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’ এবং ‘ডিক্রিয়েশন’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে। এসব বইয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সাহিত্যসমালোচনা, ইতিহাস, দর্শন ও কবিতার নানা উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’ গ্রন্থে কবিতা, স্মৃতিচারণ, প্রেমের কবিতা ও অন্যান্য আঙ্গিকের পাশাপাশি সময়, জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্নও উঠে এসেছে। বইটি গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ লাভ করে।

কারসনের কাছে সাহিত্যিক আঙ্গিক কোনো স্থির নিয়মের বিষয় নয়। একটি অভিজ্ঞতা যে ধরনের ভাষা ও কাঠামো দাবি করে, তিনি সেই অনুযায়ী লেখার রূপ নির্মাণ করেন। ফলে তাঁর রচনায় প্রচলিত কবিতার ছন্দের বদলে কখনো দেখা যায় গদ্যের মতো বাক্যবিন্যাস, আবার প্রবন্ধের যুক্তি হঠাৎ ভেঙে প্রবেশ করে কাব্যিক কোনো দৃশ্য।

এই পদ্ধতি পাঠকের কাছে বাড়তি মনোযোগ দাবি করে। তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে কাহিনির পরিণতি জানার পাশাপাশি বাক্য কীভাবে নির্মিত হচ্ছে, একটি উদ্ধৃতি কেন ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা কোনো দৃশ্য হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল কেন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাঁর সাহিত্যকে দুর্বোধ্য বলে মনে হওয়ার একটি কারণও এটি। প্রচলিত উপন্যাসে পাঠক সাধারণত চরিত্র, ঘটনা ও পরিণতির ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেন। কারসনের রচনায় সেই ধারাবাহিকতা কখনো ভেঙে যায়। পাঠককে নিজেকেই বিভিন্ন অংশের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। তবে এই ভাঙন নিছক চমক সৃষ্টির কৌশল নয়; মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি ও চিন্তা যেভাবে সরল পথে চলে না, তাঁর সাহিত্যিক কাঠামোও সেই জটিলতাকে ধারণ করে।

প্রাচীন গ্রিসের কবিদের নতুন করে পাঠ

কারসন শুধু নিজের কবিতা ও গদ্যের জন্য পরিচিত নন, প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য অনুবাদেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। স্যাফো, ইউরিপিদিস ও সফোক্লিসের মতো লেখকদের রচনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি প্রাচীন সাহিত্যের পাঠক ও আধুনিক সাহিত্যের পাঠকের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছেন।

‘ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অব স্যাফো’ গ্রন্থে তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর টিকে থাকা খণ্ডিত কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন। স্যাফোর বহু রচনাই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে; যেসব অংশ টিকে আছে, তার অনেকগুলোও অসম্পূর্ণ। কারসনের অনুবাদে এই খণ্ডিত অবস্থার গুরুত্ব রয়েছে। হারিয়ে যাওয়া শব্দের জায়গায় নিজের ভাষা বসিয়ে তিনি কবিতাকে কৃত্রিমভাবে পূর্ণ করে তোলেননি। মূল রচনার অসম্পূর্ণতাকেও পাঠের অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে রেখেছেন।

এই পদ্ধতির তাৎপর্য শুধু অনুবাদের বিশ্বস্ততায় সীমাবদ্ধ নয়। কোনো সাহিত্যকর্মের যা হারিয়ে গেছে, তা সব সময় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় না। কখনো শূন্যস্থানটিকেই স্বীকার করতে হয়। কারসনের কাজে অনুপস্থিতি ও অসম্পূর্ণতা এভাবেই অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাঁর নিজের কবিতায় আকাঙ্ক্ষা ও বিচ্ছেদের যে অনুসন্ধান দেখা যায়, স্যাফোর খণ্ডিত কবিতার সঙ্গে তাঁর এই সংযোগের মধ্যেও তার প্রতিধ্বনি খুঁজে পাওয়া যায়।

ইউরিপিদিসের নাটক অনুবাদেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। ‘গ্রিফ লেসনস’ গ্রন্থে ইউরিপিদিসের চারটি নাটকের অনুবাদ সংকলিত হয়েছে। সফোক্লিসের ‘ইলেকট্রা’ এবং ‘অ্যান অরেস্টিয়া’ নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। এসব রচনায় প্রাচীন নাটকের ভাষা ও নাটকীয়তাকে আধুনিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি মূল সাহিত্যকর্মের জটিলতাও অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা রয়েছে।

প্রাচীন গ্রিক নাটক ও কবিতার প্রতি এই আগ্রহ তাঁর মৌলিক সাহিত্যকর্মেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তবে কারসনকে শুধু ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক হিসেবে দেখলে তাঁর সৃজনশীলতার পরিধি বোঝা যাবে না। তিনি অতীতকে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি অতীতের উপাদান দিয়ে নতুন সাহিত্য নির্মাণ করেন। পুরোনো কাহিনি তাঁর কাছে সমাপ্ত কোনো রচনা নয়; বরং নতুন প্রশ্ন তোলার উপকরণ।

শোক, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া মানুষের কাছে ফেরা

কারসনের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘নক্স’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। বইটির কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর ভাইয়ের মৃত্যু এবং তাঁকে ঘিরে স্মৃতি, শোক ও হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের অনুসন্ধান। লাতিন শব্দ ‘নক্স’-এর অর্থ রাত। বইটির নাম থেকেই রচনাটির আবহ সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়—এখানে শোক কোনো ঘটনার বিবরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার দীর্ঘ ও অনিশ্চিত চেষ্টা।

বইটি প্রচলিত আত্মজীবনী বা শোকস্মৃতির মতো সাজানো নয়। এর নির্মাণে রয়েছে কবিতা, অনুবাদ, ব্যক্তিগত স্মৃতির উপাদান এবং দৃশ্যমান বিন্যাসের বিশেষ ভূমিকা। কারসন তাঁর ভাইকে স্মরণ করতে গিয়ে শুধু জীবনের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেন না; বরং স্মৃতি কীভাবে কাজ করে, মৃত মানুষের সঙ্গে জীবিতের সম্পর্ক কীভাবে বদলে যায় এবং হারিয়ে যাওয়া কাউকে বোঝার চেষ্টা কেন শেষ হয় না, সেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হন।

শোকের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো হারিয়ে যাওয়া মানুষকে স্মৃতির মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা। কিন্তু স্মৃতি সব সময় সম্পূর্ণ নয়। কিছু ঘটনা মনে থাকে, কিছু বিবরণ ঝাপসা হয়ে যায়, আবার কোনো ছোট্ট অনুষঙ্গ হঠাৎ অতীতকে তীব্রভাবে ফিরিয়ে আনে। ‘নক্স’-এ এই ভাঙা ও বিচ্ছিন্ন স্মৃতির অভিজ্ঞতা সাহিত্যিক কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে।

কারসনের লেখার সঙ্গে তাঁর দৃশ্যশিল্পের আগ্রহের সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের পৃষ্ঠায় শব্দ ও দৃশ্যমান উপাদানের বিন্যাস পাঠের অভিজ্ঞতাকে বিশেষ মাত্রা দেয়। ফলে বইটি কেবল পড়ার বিষয় নয়; এর অবয়বও অর্থ নির্মাণে ভূমিকা রাখে।

‘নক্স’ দেখিয়ে দেয়, কারসনের কাছে সাহিত্য সব সময় অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করার উপায় নয়। কখনো সাহিত্য এমন কিছু ধরে রাখার চেষ্টা, যা পুরোপুরি ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। শোকের মধ্যে মানুষ যেমন হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যায়, তাঁর এই বইও তেমন এক অসমাপ্ত কথোপকথন।

সম্পর্কিত

নোবেল বিজয়ীদের কেন ‘লরিয়েট’ বলা হয়

নিউ ইয়র্কে ‘সেলিম-আলী’ পরিষদের পক্ষে বাংলাদেশ অ্যাসেম্বলি অফ ইউএসএ-এর বিশাল গণসমর্থন ও মতবিনিময় সভা

শিক্ষকতা ও সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যের দীর্ঘ যাত্রা

লেখালেখির পাশাপাশি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন কারসন। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি ভাষা, সাহিত্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়িয়েছেন তিনি। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর শিক্ষকতা ও একাডেমিক কাজের সম্পর্ক ছিল।

শিক্ষকতা তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ধ্রুপদি সাহিত্যের পাঠ ও গবেষণার অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রাচীন রচনার গঠন, ভাষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে গভীর ধারণা দিয়েছে। সেই সঙ্গে সৃজনশীল লেখালেখি তাঁকে গবেষণার প্রচলিত সীমার বাইরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

এই দুই পরিচয়ের সমন্বয় তাঁর কাজে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি গবেষণার তথ্যকে কেবল ব্যাখ্যার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেন না; কখনো সেই তথ্যের মধ্যে গল্প খুঁজে পান, কখনো কোনো প্রাচীন চরিত্রের নীরবতার ভেতর থেকে নতুন কণ্ঠস্বর বের করে আনেন। আবার নিজের অভিজ্ঞতাকে বর্ণনা করতে গিয়ে এমন সাহিত্যিক কাঠামো নির্মাণ করেন, যা পাঠককে প্রচলিত ঘরানার বাইরে নিয়ে যায়।

তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ, টি এস এলিয়ট পুরস্কার, গুগেনহাইম ফেলোশিপ ও ম্যাকআর্থার ফেলোশিপের মতো স্বীকৃতি যুক্ত হয়েছে। এসব সম্মান তাঁর কাজের বিভিন্ন দিককে স্বীকৃতি দিয়েছে—কবিতা, অনুবাদ, গবেষণা ও সাহিত্যিক উদ্ভাবন। ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার সেই দীর্ঘ যাত্রায় যুক্ত করল আন্তর্জাতিক সাহিত্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।

কেন অ্যান কারসনকে আলাদা করে পড়তে হবে

অ্যান কারসনের সাহিত্যিক গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে তিনি কবিতা ও প্রবন্ধের মধ্যে সীমানা ভেঙেছেন, কিংবা প্রাচীন গ্রিক পুরাণকে আধুনিক গল্পে রূপ দিয়েছেন। তাঁর কাজের গভীরে রয়েছে সাহিত্যের মৌলিক একটি প্রশ্ন—মানুষের অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ভাষা ও আঙ্গিক কতটা বদলানো প্রয়োজন?

প্রেম, বিচ্ছেদ, শোক, স্মৃতি কিংবা পরিচয়ের সংকট—এসব বিষয় সাহিত্যে নতুন নয়। বহু শতাব্দী ধরে কবি ও লেখকেরা এসব নিয়ে লিখেছেন। কারসনের স্বাতন্ত্র্য হলো, তিনি পরিচিত বিষয়গুলোকে নতুনভাবে দেখার জন্য পরিচিত কাঠামোর ওপর নির্ভর করেন না। কখনো পুরাণের চরিত্রকে আধুনিক তরুণ হিসেবে উপস্থাপন করেন, কখনো দাম্পত্যের গল্পকে ২৯টি ট্যাঙ্গোর বিন্যাসে সাজান, কখনো হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের স্মৃতিকে ভাঙা দৃশ্য ও শব্দের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন।

তাঁর রচনায় অতীত ও বর্তমানের সম্পর্কও সরল নয়। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য তাঁর কাছে বর্তমানের সমস্যার জন্য তৈরি কোনো প্রস্তুত সমাধান নয়। বরং অতীতের কাহিনি ও চরিত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বর্তমানের মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে নতুন করে চিনতে পারে। এই সংলাপ কখনো হাস্যরসাত্মক, কখনো বেদনাময়, কখনো বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জিং।

তাঁর লেখা সব পাঠকের কাছে সমানভাবে সহজবোধ্য হবে, এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রচলিত কাহিনির ধারাবাহিকতা ও পরিচিত কাব্যিক ছন্দ খুঁজলে তাঁর কিছু রচনা কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁর সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতা ঠিক সেই পরিচিতির বাইরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। পাঠককে শুধু কী বলা হচ্ছে, তা নয়—কীভাবে বলা হচ্ছে এবং কেন সেই বিশেষ আঙ্গিক বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটিও বিবেচনা করতে হয়।

এই কারণেই কারসনের নোবেল পুরস্কারকে শুধু একজন কবির ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্যের একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপ এবং মানুষের জটিল অভিজ্ঞতাকে নতুন ভাষায় প্রকাশের প্রচেষ্টারও স্বীকৃতি।

অ্যান কারসন দেখিয়েছেন, পুরাণের একটি পুরোনো চরিত্রও আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতার গল্প বলতে পারে; একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রেমের গভীরতা অনুসন্ধানের মাধ্যম হতে পারে; আর শোকের ভেতর থেকে লেখা বই কেবল হারিয়ে যাওয়া কাউকে স্মরণ করে না, স্মৃতি কীভাবে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে, সেই প্রশ্নও তুলতে পারে।

সাহিত্যের শক্তি হয়তো এখানেই—পরিচিত পৃথিবীকে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করা। অ্যান কারসনের লেখায় সেই সুযোগ আসে কখনো প্রাচীন গ্রিসের কোনো কবিতার খণ্ড থেকে, কখনো লাল ডানাওয়ালা এক তরুণের প্রেমের গল্প থেকে, কখনো মৃত ভাইয়ের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। তাঁর সাহিত্য পাঠককে সহজ উত্তর দেয় না; বরং এমন কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, যেগুলোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শেষ হয় না।

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানেরই স্বীকৃতি। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের কথোপকথন চালিয়ে, ভাষার প্রতিষ্ঠিত সীমানা অতিক্রম করে এবং মানবিক অভিজ্ঞতার জটিলতাকে অক্ষুণ্ন রেখে অ্যান কারসন সমকালীন সাহিত্যে নিজের জন্য নির্মাণ করেছেন এক স্বতন্ত্র জায়গা।

শেয়ারTweetPin

সম্পর্কিতপোস্ট

‘প্রবাসী মতলব সমিতি ইন্ক’-এর বার্ষিক বনভোজন ও মিলনমেলা উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত
আন্তর্জাতিক

‘প্রবাসী মতলব সমিতি ইন্ক’-এর বার্ষিক বনভোজন ও মিলনমেলা উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত

২৭ আগস্ট ২০২৬
চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান
অর্থনীতি

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান

১৭ আগস্ট ২০২৬

সর্বশেষ

নোবেল বিজয়ীদের কেন ‘লরিয়েট’ বলা হয়

নোবেল বিজয়ীদের কেন ‘লরিয়েট’ বলা হয়

- ইউএসএ বাংলা ডেস্ক
৯ অক্টোবর ২০২৬
0

0

অ্যান কারসন: পুরাণ, প্রেম ও শোকের ভেতর দিয়ে সাহিত্যের নতুন ভাষা

অ্যান কারসন: পুরাণ, প্রেম ও শোকের ভেতর দিয়ে সাহিত্যের নতুন ভাষা

- ইউএসএ বাংলা ডেস্ক
৯ অক্টোবর ২০২৬
0

0

২০৩৪ সালের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার তাগিদ ববি হাজ্জাজের

২০৩৪ সালের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার তাগিদ ববি হাজ্জাজের

- ইউএসএ বাংলা ডেস্ক
৯ অক্টোবর ২০২৬
0

0

মেগা প্রকল্প থেকে আবাসন, নির্মাণ খাতে ফ্রেশ সিমেন্টের অগ্রযাত্রা

মেগা প্রকল্প থেকে আবাসন, নির্মাণ খাতে ফ্রেশ সিমেন্টের অগ্রযাত্রা

- ইউএসএ বাংলা ডেস্ক
৯ অক্টোবর ২০২৬
0

0

usa bangla logoo

সঠিক সংবাদ সবার আগে পেতে ইউ এস এ বাংলার সাথেই থাকুন!
ইউ এস এ বাংলা সারা বিশ্বে বাংলার মুখ!

Follow us on social media:

ইউএসএ বাংলা নিউজ
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : জালাল আহমেদ।
সম্পাদক : রাজু আলীম 

  • আমাদের সম্পর্কে
  • বিজ্ঞাপন
  • লিখতে চাইলে
  • যোগাযোগ

বিভাগ

  • English News
  • অন্যান্য
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • চাকরি
  • জাতীয়
  • নিউইয়র্ক
  • প্রযুক্তি
  • বাণিজ্য
  • বাংলাদেশ
  • বিনোদন
  • বিশ্ব
  • ভারত
  • মতামত
  • যুক্তরাষ্ট্র
  • রাজনীতি
  • শিক্ষা
  • সাফল্য
  • সারাদেশ
  • সাহিত্য
  • সুস্বাস্থ্য

সর্বশেষ

নোবেল বিজয়ীদের কেন ‘লরিয়েট’ বলা হয়

নোবেল বিজয়ীদের কেন ‘লরিয়েট’ বলা হয়

৯ অক্টোবর ২০২৬
অ্যান কারসন: পুরাণ, প্রেম ও শোকের ভেতর দিয়ে সাহিত্যের নতুন ভাষা

অ্যান কারসন: পুরাণ, প্রেম ও শোকের ভেতর দিয়ে সাহিত্যের নতুন ভাষা

৯ অক্টোবর ২০২৬
  • আমাদের সম্পর্কে
  • বিজ্ঞাপন
  • লিখতে চাইলে
  • যোগাযোগ

© 2026 JNews - Premium WordPress news & magazine theme by Jegtheme.

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • হোম
  • বিশ্ব
  • বাংলাদেশ
  • যুক্তরাষ্ট্র
  • নিউইয়র্ক
  • বিশ্ব
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • খেলা
  • চাকরি
  • মতামত
  • অন্যান্য

© 2026 JNews - Premium WordPress news & magazine theme by Jegtheme.