ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে দ্রুত নির্মাণযোগ্য, টেকসই ও কার্যকর অবকাঠামো। প্রচলিত ইট-কংক্রিটের পাশাপাশি প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড বিল্ডিং (পিইবি) ও স্টিল স্ট্রাকচার হয়ে উঠছে শিল্প-কারখানা, গুদাম ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ সমাধান। এ খাতে কাজ করছে আকিজ বশির গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আকিজ স্টিল মিলস লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ২০১৬ সালের শেষ দিকে। আকিজ বশির গ্রুপের নিজস্ব অবকাঠামো নির্মাণে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টন মানসম্পন্ন স্টিল সামগ্রীর প্রয়োজন হতো। চাহিদা অনুযায়ী উপকরণ সরবরাহে তৎকালীন বাজারের সীমাবদ্ধতা কাটাতে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় গ্রুপটি। পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রেও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে আকিজ স্টিলের কার্যক্রমের দুটি প্রধান ক্ষেত্র প্রিফ্যাব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার ও হেভি-ডিউটি র্যাক। প্রথমটির আওতায় শিল্প-কারখানা, গুদাম, শেড ও বাণিজ্যিক স্থাপনার নকশা প্রণয়ন, প্রকৌশলগত পরিকল্পনা, উৎপাদন ও স্থাপনের কাজ করা হয়। অন্যদিকে র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্প ও গুদামে উল্লম্ব স্থানসহ বিদ্যমান জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার সমাধান দেওয়া হয়।
প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড বিল্ডিংয়ের অন্যতম সুবিধা হলো নকশায় নমনীয়তা। শিল্প-কারখানায় বড় স্প্যান তৈরি, অভ্যন্তরীণ কলামের সংখ্যা কমানো এবং ভবিষ্যতে স্থাপনা সম্প্রসারণের সুযোগ বিবেচনায় রেখে এ ধরনের কাঠামো নির্মাণ করা যায়। উৎপাদনপ্রক্রিয়া, যন্ত্রপাতির বিন্যাস ও স্থানের ব্যবহার অনুযায়ী কাঠামো পরিকল্পনা করাও সম্ভব। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুসারে অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়।![]()
আকিজ স্টিল ইতিমধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১৫০ ফুট উঁচু এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ারের কেবিন রুফ নির্মাণ, মুন্সিগঞ্জের আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলে হোন্ডার প্রকল্প, গাজীপুরে বে ফুটওয়্যার লিমিটেডের ১ হাজার ২০০ টনের প্রকল্প এবং বসুন্ধরায় শান্তা এক্সিবিশন সেন্টার।
শিল্প অবকাঠামো নির্মাণেও প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জে আকিজ গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ৮ দশমিক ৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ-সমৃদ্ধ কারখানা, আকিজ পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ, সাভারে শাশা ডেনিমস এবং সাখাইয়ে সায়হাম ডেনিমসের স্পিনিং মিল ও গুদাম উল্লেখযোগ্য।
শিল্প উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য সংরক্ষণের চাহিদাও বাড়ছে। এ কারণে আধুনিক গুদাম ব্যবস্থাপনায় জায়গার কার্যকর ব্যবহার, পণ্য ওঠানো-নামানোর সুবিধা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। র্যাকিং ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে পণ্যের ওজন, গুদামের উচ্চতা, চলাচলের জায়গা এবং অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হয়।
ছাদ নির্মাণেও বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে আকিজ স্টিল। এর মধ্যে রয়েছে স্ট্যান্ডিং সিম-লক ও ক্লিপ-লক ব্যবস্থা। স্ট্যান্ডিং সিম-লক প্রযুক্তিতে দৃশ্যমান স্ক্রুর পরিবর্তে আড়ালে থাকা সংযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এতে ছাদের সংযোগস্থল দিয়ে পানি প্রবেশের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। ক্লিপ-লক ব্যবস্থায় বিশেষ ক্লিপের সাহায্যে প্যানেল স্থাপন করা হয়, যা তাপমাত্রার পরিবর্তনে ধাতব শিটের স্বাভাবিক প্রসারণ ও সংকোচনের সুযোগ দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, এ ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ৬২ দশমিক ৫ মিটার দীর্ঘ শিট তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মাণস্থলেও আরও দীর্ঘ শিট উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। বড় শিট ব্যবহারের ফলে সংযোগস্থলের সংখ্যা কমানো সম্ভব, যা নির্মাণের সময় ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনে ছাদের স্থায়িত্ব, পানি নিরোধক ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। একই সঙ্গে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের উপযোগিতা ভবিষ্যতের জ্বালানি পরিকল্পনার জন্যও প্রাসঙ্গিক। এসব বিষয় বিবেচনায় স্টিল স্ট্রাকচার ও আধুনিক ছাদপ্রযুক্তি দেশের শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্প সম্প্রসারণ ও জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজন বাড়ার সঙ্গে এ খাতের গুরুত্বও বাড়ছে।![]()