সাজেদুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান, নাভানা গ্রুপ
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ, জমির উচ্চমূল্য ও নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পরিকল্পিত জমির সংকট এবং উচ্চ সুদহারের কারণে মধ্যবিত্ত ও তরুণদের জন্য নিজস্ব আবাসনের সুযোগ সীমিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আবাসন পরিকল্পনায় সাশ্রয়ী অর্থায়ন, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জীবনযাত্রার চাহিদা বিবেচনায় আবাসনকে শুধু ফ্ল্যাটের মালিকানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমন্বিত কমিউনিটি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের বাংলাদেশের আবাসন চাহিদা বিবেচনায় নাভানা রিয়েল এস্টেট বড় পরিসরে কন্ডোমিনিয়াম ও কমিউনিটি লিভিংয়ের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব আবাসন প্রকল্পে খেলার মাঠ, সুইমিং পুল, হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার ও কমিউনিটি হলের মতো সুবিধা থাকবে। অর্থাৎ আবাসনের ধারণা ক্রমেই একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা থেকে সমন্বিত জীবনযাপন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
ভবিষ্যতের আবাসনকে পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতেও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। নতুন প্রকল্পে গ্রিন বিল্ডিং মানদণ্ড অনুসরণের পাশাপাশি ইডিজিই ও এলইইডি সনদ অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। নির্মাণে বিআইএম প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নকশা ও নির্মাণকাজের সমন্বয়, কাঁচামালের অপচয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবর্তিত কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্ল্যাটে নমনীয় কর্মপরিসর এবং বড় আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে সৌরবিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
তবে আবাসন খাতের টেকসই বিকাশের জন্য শুধু বেসরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জমির উচ্চমূল্য, নির্মাণসামগ্রীর দামের ওঠানামা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং উচ্চ সুদহারের মতো বাধাগুলোও মোকাবেলা করতে হবে। রাজউক, সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও ছাড়পত্র সমন্বিত অনলাইন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেয়া গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ঢাকা ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানসহ নগর পরিকল্পনাগুলোকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যতের নগরায়ণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
আবাসন খাতে অর্থায়ন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উচ্চ সুদের কারণে আবাসন উন্নয়নকারীদের ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে ফ্ল্যাটের দামেও। ফলে মধ্যবিত্ত ও তরুণদের জন্য গৃহঋণের কিস্তি বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ চালু করা এবং আবাসন উন্নয়নকারীদের জন্য বিশেষায়িত অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকারি অব্যবহৃত জমি কাজে লাগিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে জমির ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
একই সঙ্গে আবাসনকে রাজধানীকেন্দ্রিক প্রবণতা থেকে বের করে আনতে হবে। কেরানীগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর ও পূর্বাচলসংলগ্ন এলাকায় পরিকল্পিত স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব এলাকায় শুধু আবাসিক ভবন নির্মাণ করলে হবে না; স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, কর্মসংস্থান, বিনোদন ও যোগাযোগব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও রেলপথের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা গেলে কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শহরের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।
সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য ফ্ল্যাটের আকার ও মালিকানা অর্জনের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ছোট পরিবারের কথা বিবেচনায় ৮০০ থেকে ১১০০ বর্গফুটের কার্যকর ফ্ল্যাট নির্মাণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ২৫ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি স্বল্প সুদের ঋণ এবং ভাড়া থেকে মালিকানা অর্জনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে মাসিক ভাড়ার কাছাকাছি কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্মাণসামগ্রী আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা ও মূল্য সংযোজন কর প্রণোদনাও সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণে সহায়ক হতে পারে।
পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ভবনের নকশায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ব্যবহৃত পানি পুনর্ব্যবহার এবং উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথক করার ব্যবস্থাও আবাসিক প্রকল্পকে আরও টেকসই করতে পারে। এসব উদ্যোগ ভবনের পরিচালন ব্যয় ও পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে।
আবাসনকে বিচ্ছিন্ন কোনো খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জমির ব্যবহার, অর্থায়ন, অনুমোদন, যোগাযোগ, পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধার সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া ভবিষ্যতের আবাসন চাহিদা পূরণ করা কঠিন হবে। সরকারের নীতিগত সহায়তার সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নির্মাণ দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো গেলে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।![]()