জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। জাতীয় নির্বাচন, ধর্মীয় উৎসব, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জাতীয় অনুষ্ঠান ও জনসমাগমের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত ও পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তা কার্যক্রমেও এ বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলগাঁওয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অডিটোরিয়ামে নবনির্মিত ‘অগ্রযাত্রা ভবন’, ‘প্রান্তিক সংযোগ’ পরিষেবা, ‘প্রান্তিক শক্তি’ ও ‘ভ্রাম্যমাণ আইটি প্রশিক্ষণ সেন্টার’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় নির্বাচন, পূজা, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জাতীয় অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থলের নিরাপত্তায় আনসার সদস্যরা নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। দুর্গম পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা রক্ষায়ও তারা কাজ করছেন।
তিনি বলেন, অবৈধ পুশইন, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধেও আনসার সদস্যদের কার্যক্রম রয়েছে। পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযান, চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধ, নিখোঁজ শিশু উদ্ধার, বৃক্ষরোপণ এবং দালালবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে জননিরাপত্তা ও জনসেবায় তারা অবদান রাখছেন।
আইন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বাহিনীর সদস্যদের পেশাদারত্ব ও দায়িত্ববোধ আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদার আচরণ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও সুসংহত করতে হবে।
এ সময় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিদ্যমান তিনটি পৃথক আইন একীভূত করে একটি সমন্বিত ও একক ‘আনসার বাহিনী আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাহিনীকে আরও সুসংগঠিত, গতিশীল ও আধুনিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তেজগাঁওয়ে নির্মিতব্য নতুন সদর দপ্তর নিয়েও বিস্তারিত তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ৩ দশমিক ৪২৮ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া এ আধুনিক সদর দপ্তর শুধু নতুন একটি অবকাঠামো নয়; বাহিনীর সংস্কার, আধুনিকায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তার ভাষ্য, নির্মিতব্য বহুতল ভবনটি আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, দ্রুত তথ্য বিনিময়, সেন্ট্রাল অপারেশন মনিটরিং, কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আধুনিক কমান্ড সেন্টার হিসেবে গড়ে উঠবে।
নারীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়েও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উদ্যোগে নারীদের জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্পের মাধ্যমে সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আত্মকর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ডিজিটালাইজেশনকেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তার মতে, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বিস্তারের মাধ্যমে বাহিনীর সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও জোরদার করা সম্ভব।
এর আগে সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের ‘শুভারম্ভ ফলক’ উন্মোচন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাহিনীর সদস্যদের নতুন উদ্দীপনা নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান এবং রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে যৌথ অভিযানের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি ও আনসার বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নির্মূলে এ ধরনের সমন্বিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও জোরদার করা হবে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন দাবিদাওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাদের দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
নতুন অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আইনি কাঠামোর সংস্কারের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আরও আধুনিক ও কার্যকর বাহিনীতে রূপান্তরের লক্ষ্য তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনসেবায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাহিনীর পেশাদারত্ব ও সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।![]()