আফগানিস্তান থেকে ইরান: ইতিহাসের একই ফাঁদে আবারও যুক্তরাষ্ট্র?
পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের আগস্টে কাবুল বিমানবন্দরের সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য গোটা বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকের আফগান অভিযানকে এক নির্মম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ মরিয়া হয়ে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছে, মার্কিন সামরিক বিমানের ডানায় ঝুলে পালানোর চেষ্টা করছে কেউ, তালেবান বিনা বাধায় রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে—এই দৃশ্য শুধু একটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
দুই দশক আগে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছিল ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। সেই যুদ্ধের প্রথম লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তান। আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা, তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু ২০ বছর, প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় এবং হাজারো প্রাণহানির পর যে বাস্তবতা সামনে আসে, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে, আফগানিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্র অপমানজনকভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
এই অভিজ্ঞতা থেকে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন আর কখনো দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি সামরিক অভিযানের ঝুঁকি নেবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষক সাইমন টিসডালের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং সামরিক পদক্ষেপ সেই পুরোনো ভুলেরই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। তাঁর মতে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র আবারও এমন এক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে, যার শেষ কোথায়—তা কেউ জানে না।
আফগানিস্তান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করা যায় না। একটি দেশ দখল করা সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই দেশ পরিচালনা, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর বাহিনী আফগানিস্তানে দুই দশক অবস্থান করেও এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারেনি, যা বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। ফলে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো ব্যবস্থাটি ধসে পড়ে।
ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক কার্টার মালকাসিয়ান, যিনি আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর বেসামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, মনে করেন যুদ্ধের মূল ভিত্তিটিই ছিল দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করেছিল, আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নিলে দেশটি আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হবে এবং সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা সংগঠিত হবে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে বাস্তবতা সেই আশঙ্কাকে সমর্থন করেনি। আফগানিস্তানভিত্তিক কোনো সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য হামলা চালাতে পারেনি।
অর্থাৎ যে ভয়কে কেন্দ্র করে দুই দশকের যুদ্ধ চালানো হয়েছিল, পরে দেখা গেল সেই ভয় অনেকটাই অতিরঞ্জিত ছিল। অথচ সেই যুদ্ধের মূল্য ছিল ভয়াবহ। দুই হাজার চার শতাধিক মার্কিন সেনা, শত শত ব্রিটিশ সেনা এবং হাজার হাজার আফগান বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কোটি কোটি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়। একটি প্রজন্ম যুদ্ধের মধ্যে বেড়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ব্যয়ের পাশাপাশি মানবিক ক্ষতিও ছিল অপূরণীয়।
এই অভিজ্ঞতা শুধু আফগানিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাকে আগ্রাসন চালায়, তখনও একই ধরনের যুক্তি সামনে আনা হয়েছিল। দাবি করা হয়েছিল, সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং তিনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে সহায়তা করছেন। পরে আন্তর্জাতিক তদন্তে এসব দাবির কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তথাপি সেই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের পুরো রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেয়, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাড়িয়ে তোলে এবং নতুন জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানের পথ তৈরি করে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানজুড়ে নাইন-ইলেভেন–পরবর্তী যুদ্ধ ও সহিংসতায় প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এর বাইরে যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব—দুর্ভিক্ষ, রোগ, বাস্তুচ্যুতি ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে—আরও প্রায় ৩৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভুল সিদ্ধান্তের মানবিক মূল্য।
সাইমন টিসডালের যুক্তি হলো, ইরানকে ঘিরে বর্তমান মার্কিন অবস্থানেও একই ধরনের মানসিকতা কাজ করছে। ইরানকে এমন এক অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার বাস্তবতা নিয়ে এখনও গুরুতর বিতর্ক রয়েছে। ইরাক যুদ্ধের আগে যেমন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভয় দেখানো হয়েছিল, তেমনি এখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা মূল্যায়নের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু উদ্বেগ আর যুদ্ধ—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। কূটনীতি, আন্তর্জাতিক তদারকি এবং নিষেধাজ্ঞার পথ এড়িয়ে সামরিক সংঘাতকে অগ্রাধিকার দিলে তার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, আফগানিস্তান ও ইরাক তার স্পষ্ট উদাহরণ।
এই বিশ্লেষণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিতে প্রায়ই ভয়, অতিরঞ্জন এবং রাজনৈতিক প্রয়োজন একসঙ্গে কাজ করে। কোনো সম্ভাব্য হুমকিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। পরে দেখা যায়, সেই হুমকির বাস্তবতা অনেক কম ছিল, কিন্তু যুদ্ধের ক্ষতি ছিল বহুগুণ বেশি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ পছন্দ করেন না। কিন্তু বাস্তবে তাঁর মধ্যপ্রাচ্যনীতি সেই ঘোষণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইরানে হামলা, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপগুলো নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে।
এখানে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র কেন বারবার এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যার শেষ পর্যন্ত ফল হয় রাজনৈতিক ব্যর্থতা? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখার মানসিকতা, কৌশলগত আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের মতো স্বার্থ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কিংবা মানবাধিকার রক্ষার ভাষ্য প্রায়ই এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যকে আড়াল করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
হরমুজ প্রণালির উদাহরণই তা স্পষ্ট করে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় এই অঞ্চলে যে কোনো উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। ফলে নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থও গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতেও এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চল নিয়েও ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতা বহন করে। ভেনেজুয়েলা, কিউবা, পানামা, কলম্বিয়া কিংবা গ্রিনল্যান্ড—এসব অঞ্চলকে ঘিরে তাঁর বক্তব্য ও পদক্ষেপে এমন একটি ধারণা ফুটে ওঠে যে, পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রশ্নাতীত হওয়া উচিত। সমালোচকদের মতে, এই মানসিকতাই পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু সেই যুদ্ধের শিক্ষা এখনও শেষ হয়নি। ইতিহাস দেখিয়েছে, যুদ্ধ শুরু করা সহজ; শেষ করা কঠিন। একটি সামরিক বিজয় রাজনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত প্রায়ই নতুন সংকট, নতুন শত্রু এবং নতুন অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়।
আজ যখন ইরানকে কেন্দ্র করে আবার উত্তেজনা বাড়ছে, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—ওয়াশিংটন কি সত্যিই আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে? নাকি আবারও একই যুক্তি, একই ভয় এবং একই আত্মবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে এমন এক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেই নয়, পুরো বিশ্বকে?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই—যুদ্ধের সিদ্ধান্ত মুহূর্তের, কিন্তু তার পরিণতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে। আফগানিস্তান সেই সত্যের এক নির্মম স্মারক। আর যদি সেই শিক্ষা উপেক্ষিত হয়, তবে ইরান হয়তো হয়ে উঠতে পারে একই ইতিহাসের আরেকটি নতুন অধ্যায়।![]()