ফ্রিডম ২৫০ শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যতেরও সূচনা
ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন
ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে ‘আমেরিকা সপ্তাহ’। এ উপলক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, কূটনীতি এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের তাৎপর্য, বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, আজ থেকে আড়াই শতাব্দী আগে, ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তার ভাষায়, সেই দলিল শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা ছিল না; বরং এটি ছিল এমন এক আদর্শের প্রকাশ, যেখানে মানুষের জন্মগত অধিকার, স্বাধীনতা এবং জনগণের সম্মতিতে পরিচালিত সরকারের ধারণাকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বহুল উদ্ধৃত অংশ উল্লেখ করে বলেন, সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং সৃষ্টিকর্তা তাদের এমন কিছু অধিকার দিয়েছেন, যা কেড়ে নেওয়া যায় না। এর মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখ অন্বেষণের অধিকার। মানুষের এসব অধিকার রক্ষার জন্যই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণের সম্মতিই সরকারের বৈধ ক্ষমতার উৎস।
ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত মোটেও সহজ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা জানতেন, তাদের এই পদক্ষেপ ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে সামনে অপেক্ষা করছে দীর্ঘ, কঠিন এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। তারপরও তারা নিজেদের জীবন, সম্পদ এবং সম্মান বাজি রেখে স্বাধীনতার পক্ষে অটল ছিলেন। তার মতে, সেই আত্মত্যাগই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি গড়ে দেয় এবং পরবর্তী আড়াই শতাব্দী ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
রাষ্ট্রদূত তার লেখায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যও তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায়, মাত্র একটি পার্চমেন্ট কাগজ এবং ৫৬টি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল। সেই ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ শুধু স্বাধীনতার দাবি জানিয়েই থেমে থাকেনি; বরং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে।
তিনি বলেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন আবারও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। বরং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যেমন মিত্রদের সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি বর্তমান বিশ্বেও অংশীদারত্ব, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সহযোগিতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, একটি দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—এই দুই বিষয় একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশই নিজ নিজ জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই অভিন্ন লক্ষ্য থেকেই সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তিনি বলেন, যেখানে দুই দেশের স্বার্থ মিলিত হয়, সেখানে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং সেটিই কার্যকর কূটনীতির মূল ভিত্তি।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি এবং মে মাসে সম্পাদিত জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। তার মতে, এসব উদ্যোগ বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, জ্বালানি, শিল্প এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শুধু অর্থনীতি বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ভিত্তিতে এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘ফ্রিডম ২৫০’ কর্মসূচি কেবল অতীতের অর্জন স্মরণ করার উদ্যোগ নয়; এটি আগামী দিনের অংশীদারত্ব, উদ্ভাবন এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি নির্মাণের একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ—স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মুক্তির চেতনাকে নতুনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার ইতিহাস এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে আরও সচেতন করার উদ্যোগও এর অংশ।
রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উদযাপনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র শুধু তার অতীতের গৌরবকেই স্মরণ করছে না; একই সঙ্গে কূটনীতির সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যকেও মূল্যায়ন করছে, যা দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, আগামী ২৫০ বছরের বিশ্বব্যবস্থায় উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, মুক্ত বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্কই হবে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সহযোগিতা ও সমর্থনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশের জনগণও সেই বন্ধুদের অন্যতম। স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির এই বিশেষ মুহূর্তে দুই দেশের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এ উপলক্ষে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ‘আমেরিকা সপ্তাহ’। পাশাপাশি ২০২৬ সালজুড়ে স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক, কূটনৈতিক ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। এসব আয়োজন ‘ফ্রিডম ২৫০’ বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের জনগণকে এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতা, বন্ধুত্ব এবং অভিন্ন ভবিষ্যতের যৌথ অঙ্গীকারই দুই দেশের সম্পর্ককে আগামী দিনেও আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।