ঋণখেলাপি মুক্ত থাকাই ব্যবসার বড় মর্যাদা: মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল
চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর
মেঘনা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)
রাজু আলীম
বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য নয়, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতীক হিসেবেও উচ্চারিত হয়। মেঘনা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই সেই ধরনের একটি নাম। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সীমিত শিল্প সীমানায় ১৯৭৬ সালে মাত্র ৬৫০ টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করা একটি ছোট ব্যবসায়িক উদ্যোগ আজ কীভাবে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বার্ষিক টার্নওভারের শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হলো, সেই গল্প বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও শিল্প ইতিহাসে এক অনবদ্য উপাখ্যান। আর এই গল্পের কেন্দ্রে আছেন মোস্তফা কামাল। একজন উদ্যোক্তা, যিনি প্রতিকূলতাকে সুযোগে রূপান্তর করার বিরল দক্ষতা দেখিয়েছেন।![]()
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া মোস্তফা কামালের ব্যবসায়িক যাত্রা কোনো প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক শিল্পভিত্তির ওপর ছিল না। বরং শুরুটা ছিল সীমিত সম্পদ, অনিশ্চয়তা এবং প্রবল ঝুঁকির মধ্য দিয়ে। পরিবারের জমি বন্ধক রেখে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়েই তিনি ব্যবসায় নামেন। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কামাল ট্রেডিং কোম্পানি। ছোট পরিসরের পণ্য কেনাবেচার মধ্য দিয়ে ব্যবসার হাতেখড়ি হয়। প্রথম জীবনে লাভ যেমন এসেছে, তেমনি ক্ষতির অভিজ্ঞতাও ছিল তীব্র। কিন্তু সেসব ব্যর্থতাই তাকে শিখিয়েছে কীভাবে সংকটের মধ্যেও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হয় এবং কীভাবে ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনুধাবন করতে হয়।
১৯৮৯ সাল ছিল তার ব্যবসায়িক জীবনের মোড় ঘোরানো সময়। ওই বছর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল, যা ছিল এমজিআইয়ের প্রথম শিল্পকারখানা। মেঘনা নদীর তীরে গড়ে ওঠা সেই কারখানাই পরবর্তীকালে বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের বাজার তখন ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর ছিল। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে যেমন আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
এই সময় থেকেই মোস্তফা কামাল ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করতে শুরু করেন। বাজারে যে পণ্যের ঘাটতি রয়েছে, সেই খাতেই তিনি বিনিয়োগ করেছেন। তার ভাষায়, “যখন দেখি বাজারে কোনো পণ্যের সংকট আছে, তখনই আমি সেই খাতে ব্যবসা বাড়াই।” এই বাস্তবভিত্তিক ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিই এমজিআইকে ধীরে ধীরে ভোগ্যপণ্য, সিমেন্ট, দুগ্ধজাত পণ্য, প্যাকেজিং, কেমিক্যাল, শিপিং, বিদ্যুৎ, কাগজ, স্বাস্থ্যসেবা, রিয়েল এস্টেট ও আর্থিক সেবাসহ অসংখ্য খাতে বিস্তৃত করেছে।
এমজিআইয়ের যাত্রায় একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—সংকটকে তারা প্রায়ই নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনায় রূপ দিয়েছে। ব্যবসার শুরুতে একবার চট্টগ্রাম বন্দরে পাম অয়েলের একটি চালান দীর্ঘদিন আটকে থাকায় তা নষ্ট হয়ে যায়। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন মোস্তফা কামাল। সেটিই ছিল তার জীবনের প্রথম ব্যাংক ঋণখেলাপির অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই ঘটনাই তাকে আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করায়। পরবর্তীকালে তিনি এমনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন যে এমজিআই আর কখনো ঋণখেলাপি হয়নি। বাংলাদেশের ব্যবসা খাতে যেখানে অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিয়মিত ঋণখেলাপির অভিযোগ ওঠে, সেখানে এমজিআইয়ের এই রেকর্ড প্রতিষ্ঠানটির জন্য বিশেষ মর্যাদা তৈরি করেছে।
শুধু আর্থিক শৃঙ্খলাই নয়, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাকেও তিনি নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। কোনো পণ্যের প্যাকেজিংয়ে সমস্যা হলে তিনি নিজেই কার্টন কারখানা স্থাপন করেন। অর্থাৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয় ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ। এর ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমেছে, অন্যদিকে বহির্ভরশীলতাও হ্রাস পেয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমজিআই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির শিল্প ইউনিটের সংখ্যা ৫৪টিরও বেশি। ভবিষ্যতে আরও নতুন ইউনিট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালের পর প্রতিষ্ঠানটি নতুন এক রূপান্তরমূলক ধাপে প্রবেশ করে। বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় এমজিআই। Meghna Economic Zone, Meghna Industrial Economic Zone এবং Comilla Economic Zone প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিল্পায়নের নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলে মেঘনা গ্রুপ। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এমজিআইকে পথিকৃৎ বলা হয়।
করপোরেট সম্প্রসারণের মধ্যেও মোস্তফা কামাল এমজিআইয়ের উত্থানের সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির পরিবর্তনের সম্পর্কও গভীর। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় দেশটির শিল্পখাত মূলত সীমিত কয়েকটি পণ্যে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু এমজিআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ভোগ্যপণ্য থেকে নির্মাণসামগ্রী পর্যন্ত বহু খাতে দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করেছে। “ফ্রেশ”, “নম্বর ওয়ান”, “অ্যাকটিফিট” কিংবা “মেঘনাসিম সুপার ডিলাক্স”-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে হাতে-কলমে নেতৃত্বের ধারা বজায় রেখেছেন মোস্তফা কামাল। এখনও নিয়মিতভাবে কারখানা পরিদর্শন করেন এবং উৎপাদন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখাকে তিনি ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন। তার এই সক্রিয় উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলেছে।
একই সঙ্গে তিনি পারিবারিক ধারাবাহিকতাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া তার সন্তানরা দেশে ফিরে ব্যবসার বিভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর ফলে এমজিআই কেবল একটি ব্যক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান না থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়িক গোষ্ঠীতে উত্তরসূরি সংকট দেখা গেলেও এমজিআই তুলনামূলকভাবে সংগঠিত রূপান্তরের পথে এগিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন, ডলারের অস্থিরতা কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট—সবকিছুর মধ্যেও এমজিআই নিজেদের সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় যখন অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা সংকোচনের পথে হাঁটছিল, তখন মোস্তফা কামাল উল্টো বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে সমুদ্রগামী জাহাজ খাতে প্রবেশ করে এমজিআই। পরে সেই বিনিয়োগই প্রতিষ্ঠানটির জন্য লাভজনক সম্পদে পরিণত হয়। এই সিদ্ধান্ত তার ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে এমজিআইয়ের আরও কয়েকটি বড় প্রকল্প দেশের শিল্পখাতে আলোচনায় রয়েছে। প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের গ্রিন স্টিল মিল, ২০০ মিলিয়ন ডলারের পেপার মিল এবং ২০০ মিলিয়ন ডলারের গ্লাস ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ব্যাপ্তি তুলে ধরে। পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের আরও শক্তিশালী করতে চায়।
এমজিআইয়ের উত্থান কেবল একটি করপোরেট সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্পায়নের বিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে উত্তরণের যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, সেখানে দেশীয় উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোস্তফা কামাল সেই উদ্যোক্তাদেরই একজন, যিনি সীমিত পুঁজি থেকে শুরু করে শিল্প, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক বাস্তবতায় যেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে এমজিআইয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি একটি বিশেষ উদাহরণ। তাদের যাত্রা দেখায় যে দূরদর্শিতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং বাজারের প্রয়োজন বোঝার সক্ষমতা থাকলে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীও আন্তর্জাতিক মানের অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।
পাঁচ দশকের এই যাত্রায় এমজিআই শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্পায়নের প্রতীক হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর মোস্তফা কামালের গল্প মনে করিয়ে দেয় উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় শক্তি পুঁজি নয়, বরং সংকটের মধ্যেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা।
এমজিআইয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকে তাকালে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি শুধু দেশের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শিল্প প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে অবকাঠামো, ভারী শিল্প এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনে বিনিয়োগের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ শিল্প উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পনীতি গ্রহণ করছে। এমজিআইও সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অবকাঠামো গড়ে তুলছে।
বাংলাদেশের শিল্পখাতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ সবসময়ই ছিল আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ও বৈশ্বিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ডলারের দাম বৃদ্ধি কিংবা আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজারে পড়ে। এমজিআই এই ঝুঁকি কমানোর জন্য উৎপাদন শৃঙ্খলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার কৌশল গ্রহণ করেছে। শিপিং, প্যাকেজিং, কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা একটি সমন্বিত শিল্প কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
এমজিআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শিল্প ইউনিটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষ কাজ করছেন। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সামাজিক গুরুত্ব এখানেই তারা শুধু পণ্য উৎপাদন করে না, বরং অর্থনীতির ভেতরে একটি বৃহৎ কর্মযজ্ঞও তৈরি করে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিও সচল হয়। এমজিআইয়ের বিভিন্ন শিল্প ইউনিটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পরিবহন, আবাসন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
শিল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। সেই বিবেচনায় আধুনিক যন্ত্রপাতি, অটোমেশন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে গ্রিন স্টিল মিল প্রকল্পকে এমজিআই ভবিষ্যতের টেকসই শিল্প বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে। বিশ্বজুড়ে এখন পরিবেশবান্ধব শিল্প উৎপাদনের ওপর জোর বাড়ছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমজিআইয়ের নতুন প্রকল্পগুলো সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে মোস্তফা কামালের গ্রহণযোগ্যতার একটি কারণ হলো তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে তিনি দীর্ঘদিন ধরে একজন নির্ভরযোগ্য উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। ব্যবসায়িক জগতে যেখানে অনেক সময় অতিরিক্ত ঋণনির্ভর সম্প্রসারণ বড় সংকট তৈরি করে, সেখানে এমজিআই তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও হিসাবভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পথ অনুসরণ করেছে। পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা এবং পরিকল্পিত ব্যাংক অর্থায়নের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি বড় বড় শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
একই সঙ্গে এমজিআইয়ের উত্থান বাংলাদেশের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্যের মধ্যেও দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলো যে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন, বিপণন ও ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারে, এমজিআই তার প্রমাণ। দেশের বাজারে ভোগ্যপণ্য খাতে যে শক্তিশালী ব্র্যান্ড প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, সেখানে এমজিআই একটি বড় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এত বড় শিল্প সাম্রাজ্যের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের চাপ, ডলারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের শিল্পখাতকে নতুন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে। পাশাপাশি টেকসই শিল্পায়ন, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এমজিআইয়ের ভবিষ্যৎ সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে তারা কত দ্রুত এসব পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে তার ওপর।
তারপরও পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট এমজিআই সবসময় সংকটকে শুধুমাত্র বাধা হিসেবে দেখেনি। বরং প্রতিটি সংকটের ভেতর নতুন সম্ভাবনা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। হয়তো এ কারণেই ছোট একটি ট্রেডিং কোম্পানি থেকে শুরু করে আজ তারা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উত্তরণের স্বপ্ন দেখছে, তখন এমজিআইয়ের মতো শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেবল সরকারি নীতির ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে এমন উদ্যোক্তাদের ওপর, যারা ঝুঁকি নিতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারে এবং দেশের উৎপাদন সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। সেই বিবেচনায় মেঘনা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ আজ শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের প্রতীক।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব