চট্টগ্রাম ব্যুরো
ফ্যাসিবাদ ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় হেফাজতে ইসলাম যেভাবে বিএনপির পাশে ছিল, ভবিষ্যতেও একইভাবে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আগামী দিনেও আমরা একসঙ্গে থাকব। হেফাজতে ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
রোববার বিকেলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফটিকছড়ির বাবুনগরীতে হেফাজত আমিরের দোয়া নিতে এসেছি।’ তিনি বলেন, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেফাজতে ইসলাম ও বিএনপি একসঙ্গে থেকে কাজ করেছে। এর ফলে দেশকে বিপদ থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে দেশের সমস্যা এখনো শেষ হয়নি।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের সময় দেশে বিপুল অর্থ লুটপাট হয়েছে। নির্বাচনের পরও বিভিন্ন সমস্যা সামনে এসেছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।![]()
ফটিকছড়ির স্থানীয় সমস্যার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলাকায় হাসপাতালের সমস্যা রয়েছে। শিক্ষার সমস্যা রয়েছে। স্কুল-কলেজ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর দাবি রয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যাও রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করবে।
দেশের গ্যাসসম্পদ নিয়ে আগের সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়ে দেশে নিজেদের গ্যাস আছে কি না, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়নি। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে অন্য দেশ বাংলাদেশ থেকে গ্যাস নিয়ে গেছে। বর্তমানে গ্যাসের সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ শুরু করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময়কালে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে লিখিত ৯ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। সংগঠনের মহাসচিব মুহাম্মাদ সাজেদুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর হাতে একটি অভিনন্দনপত্র তুলে দেন। ওই অভিনন্দনপত্রে সংগঠনটির বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হেফাজতের দাবির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন। সংগঠনটি মহান আল্লাহ, রাসুলুল্লাহ (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাসের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করারও দাবি করেছে তারা।
২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চেয়েছে হেফাজতে ইসলাম। পাশাপাশি ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এসব বিচারের মাধ্যমে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি তাদের।
কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও হেফাজতের ৯ দফা দাবিতে গুরুত্ব পেয়েছে। সংগঠনটি দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি মাদরাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা হয়েছে।
হেফাজতের দাবি, এ স্বীকৃতি কার্যকর হলে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে। সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থায় তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতিও আরও কার্যকর হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি করেছে সংগঠনটি।
কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করার দাবিও রয়েছে হেফাজতের ৯ দফায়। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের কথিত ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলেমদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহারের দাবিও করেছে হেফাজত। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে আলেম-ওলামাকে অংশীদার করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা পরিচালনা নিয়েও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটি বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম এবং টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার ধারা অব্যাহত রাখার দাবি করেছে।
এর সঙ্গে ভারতের মাওলানা সা’দ কান্ধলভির বাংলাদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে হেফাজত। পাশাপাশি টঙ্গীর ময়দানে সা’দপন্থিদের ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ আলেমরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তারা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় বিষয়, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।
হেফাজতের পক্ষ থেকে দেওয়া অভিনন্দনপত্রে ফটিকছড়ির ঐতিহাসিক জনপদ বাবুনগরে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে স্বাগত জানানো হয়। উলামায়ে কেরাম ও স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়।
অভিনন্দনপত্রে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং সাবেক আমির আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীসহ ‘ইসলাম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে আত্মত্যাগী’ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করবে বলে জানান। স্থানীয় সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে বাবুনগর মাদরাসা ও আশপাশের এলাকায় হেফাজতে ইসলাম এবং স্থানীয় আলেম-ওলামাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে মাদরাসা এলাকায় দলীয় ও ধর্মীয় নেতাদের উপস্থিতিও ছিল।
এর আগে রোববার বিকেল ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টার ফটিকছড়ি উপজেলার পাইন্দং এলাকায় অবতরণ করে। পরে সড়কপথে প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া বাবুনগর মাদরাসায় পৌঁছান।
সেখানে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় হেফাজতের পক্ষ থেকে তাদের ৯ দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে দেওয়া হয়। জবাবে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতেও হেফাজতের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।![]()