রূপগঞ্জের মাদকবিরোধী অভিযান: কঠোর প্রশাসন, মানবিক নেতৃত্ব ও বদলে যাওয়ার গল্প
মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন নয়, ধীরে ধীরে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করে। নেশার অন্ধকারে হারিয়ে যায় তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনা; ভেঙে পড়ে পারিবারিক বন্ধন, বাড়ে অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মিত অভিযান, দুর্বল নজরদারি ও ধারাবাহিক প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
তবে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ভিন্ন এক চিত্র তৈরি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত ধারাবাহিক মাদকবিরোধী অভিযান দেখিয়েছে, মাঠপর্যায়ের প্রশাসন আন্তরিক ও দৃঢ় হলে একটি উপজেলার সামাজিক পরিবেশ বদলে দেওয়া সম্ভব।
চার মাসে চার শতাধিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম মাদক, ভূমিদখল, ভেজাল ও জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেন। এরই অংশ হিসেবে গত চার মাসে রূপগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
এই সময়ে চার শতাধিক মাদক কারবারি ও সেবনকারীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রভাবশালী পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান কাউকে আইনের বাইরে রাখেনি।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিচ্ছিন্ন অভিযানের পরিবর্তে ধারাবাহিক নজরদারি ও নিয়মিত আইন প্রয়োগই এই অভিযানের সবচেয়ে বড় শক্তি। ফলে অনেক এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
যেসব এলাকায় ছিল প্রকাশ্য মাদকের আস্তানা
রূপগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় একসময় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের অভিযোগ ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর কিছু এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলও অনিরাপদ হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের বিস্তার নিয়ে পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন ছিল।
সাম্প্রতিক অভিযানের পর সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। প্রশাসনের নিয়মিত টহল, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারণে মাদক কারবারিদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আগে যেসব স্থানে প্রকাশ্যে নেশা চলত, সেখানে এখন প্রশাসনের নজরদারি দৃশ্যমান।
অনেক অভিভাবক বলছেন, সন্তানদের নিয়ে আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন তারা। যদিও মাদক পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, তবু প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি অপরাধীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু অভিযান নয়, সচেতনতাও সমান গুরুত্ব
উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান বলেন, তরুণ সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে ইউএনও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছেন। গত চার মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে চার শতাধিক মাদক কারবারি ও সেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, মাদকবিরোধী জনসচেতনতা তৈরিতেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মাদকের ক্ষতিকর দিক, পারিবারিক ভূমিকা এবং সামাজিক প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে আইন ও সচেতনতা—দুই দিকই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শুধু গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না; নতুন প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
কঠোর প্রশাসকের পাশাপাশি মানবিক মুখ
স্থানীয়দের মতে, ইউএনও সাইফুল ইসলামের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ তাঁর মানবিক আচরণ। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বাইরে তিনি অসহায়, দরিদ্র ও অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে নানা সমস্যা নিয়ে মানুষ উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে আসেন। কেউ চিকিৎসা সহায়তা চান, কেউ আর্থিক সংকটে পড়েন, আবার কেউ জমি বা পারিবারিক বিরোধের সমাধান চান। স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেক অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করেছেন ইউএনও।
রাহেলা খাতুন বলেন, একজন কর্মকর্তা কঠোর হতে পারেন, কিন্তু মানুষের কথা শোনার মানসিকতা থাকলে সাধারণ মানুষ প্রশাসনের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান জুয়েল মিয়াও। তাঁর মতে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ইউএনওর আচরণ আন্তরিক। এ কারণেই অনেক মানুষ সরাসরি উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাতে সাহস পাচ্ছেন।
মাদকবিরোধী লড়াই কেন শুধু পুলিশের নয়
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদক নির্মূলকে শুধু পুলিশের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠন—সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
রূপগঞ্জের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পুলিশ অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার করছেন, প্রশাসন নজরদারি বাড়াচ্ছে এবং একই সঙ্গে জনসচেতনতাও গড়ে তুলছে। এই সমন্বিত পদ্ধতিই ইতিবাচক পরিবর্তনের মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, মাদক ব্যবসা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। তাই এর বিরুদ্ধে লড়াইও হতে হবে পরিকল্পিত, ধারাবাহিক এবং বহু সংস্থার সমন্বয়ে।
প্রশাসনের দৃশ্যমান উপস্থিতিই বদলে দেয় বাস্তবতা
বাংলাদেশে মাদকবিরোধী আইন নতুন নয়। কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইনের কার্যকর প্রয়োগই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় অভিযানের ধারাবাহিকতা না থাকায় কারবারিরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
রূপগঞ্জে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান সাধারণ মানুষের কাছে একটি বার্তা দিয়েছে—আইন কার্যকর হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই দৃশ্যমান অবস্থানই জনমনে আস্থা তৈরি করেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অভিভাবকদের অনেকে বলছেন, আগে মাদক নিয়ে অভিযোগ করেও ফল পাওয়া যেত না বলে মানুষ নিরুৎসাহিত হতো। এখন প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে অভিযোগ জানাতে মানুষ আগ্রহী হচ্ছে।
ইউএনও যা বললেন
রূপগঞ্জ ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম নিজের ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, “আমি প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। সরকারকে সহযোগিতা করতে এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিবেশ ঠিক রাখতে আমি বদ্ধপরিকর।”
তিনি জানান, মাদক, সন্ত্রাস ও সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও জোরদার করা হবে।
একটি উপজেলার অভিজ্ঞতা, সারা দেশের জন্য বার্তা
রূপগঞ্জের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব একটি বড় সামাজিক সমস্যার মোকাবিলায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। নিয়মিত অভিযান, দ্রুত আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং মানবিক প্রশাসনিক আচরণ—এই চারটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে মাদকের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, দেশের প্রতিটি উপজেলা ও জেলায় যদি একই ধরনের ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে মাদকের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। কারণ অপরাধ কমাতে শুধু কঠোর আইন নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান প্রশাসনিক তৎপরতা, জনসম্পৃক্ততা এবং মানুষের আস্থা অর্জনকারী নেতৃত্ব।
রূপগঞ্জের উদ্যোগ তাই শুধু একটি উপজেলার সফল অভিযান নয়; এটি প্রমাণ করেছে যে দায়িত্বশীল মাঠ প্রশাসন চাইলে একটি সমাজকে ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।