ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর প্রায় সবাই রপ্তানি কমার মুখে পড়লেও তাদের কারও পতন বাংলাদেশের মতো এতটা হয়নি। সবচেয়ে কম পতন হয়েছে ভিয়েতনামের, মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিস ইউরোস্ট্যাটের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশে বাংলাদেশ ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে ১৬৯ কোটি ৯৬ লাখ ইউরো।![]()
এ সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতারা বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৪ হাজার ১১০ কোটি ১৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় এই আমদানিও কমেছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের পোশাকের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়েছে। তবে বাজার সংকোচনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি পড়েছে।
ইউরোপের পোশাকবাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। ভারত থেকে কমেছে ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং পাকিস্তান থেকে ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। কম্বোডিয়ার রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২০ শতাংশ।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম প্রায় স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। দেশটির তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ, একই বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যেও ভিয়েতনাম যেখানে বাজার ধরে রাখতে পারছে, সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে দ্রুত কমছে।
ইউরোপের বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর একটি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও জোট হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারের গুরুত্ব আরও বেশি। ফলে ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ীভাবে রপ্তানি কমতে থাকলে তা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ এবং শিল্পের কর্মসংস্থানে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
শুধু ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৪০০ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি দেশ তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে। একই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ০৮ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কম্বোডিয়ার, ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই ধরনের কারণই রয়েছে। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের মতে, ইউরোপের বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে পোশাকের চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে চীন আগ্রাসী বিপণনের মাধ্যমে ইউরোপে ক্রয়াদেশ বাড়াচ্ছে। এর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে কিছু ক্রয়াদেশ ভারতের দিকে সরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য সমস্যাটি শুধু ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া নয়; উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পোশাক কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দাম দেওয়ার ক্ষেত্রে চাপের মুখে রয়েছে।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের আরেকটি দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে পণ্যের দামের পরিসংখ্যানে। পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ চীনের চেয়েও বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে। কিন্তু আয়ের দিক থেকে চীন অনেক এগিয়ে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৫৯ কোটি ৬২ লাখ কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৬২ কোটি ৩০ লাখ কেজি। অর্থাৎ পরিমাণের হিসাবে বাংলাদেশ চীনের চেয়ে ২ কোটি ৬৮ লাখ কেজি বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে।
কিন্তু মূল্যের হিসাবে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চীন এই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আয় করেছে ১ হাজার ১৮২ কোটি ২৬ লাখ ইউরো। বাংলাদেশের আয় ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ ইউরো। অর্থাৎ বেশি পরিমাণ পোশাক পাঠিয়েও বাংলাদেশ চীনের চেয়ে প্রায় ৩১৮ কোটি ইউরো কম আয় করেছে।
এর মূল কারণ পোশাকের একক মূল্য। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুন সময়ে চীন প্রতি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৩ ইউরো দরে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দাম মাত্র ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরো। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। চীনের কমেছে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অর্থাৎ বাংলাদেশ শুধু কম পোশাক বিক্রি করছে না, একই সঙ্গে কম দামে পোশাক বিক্রি করছে। রপ্তানি আয় কমার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেও যদি ইউনিট মূল্য কমে যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমবে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি শিল্পের মুনাফা, বিনিয়োগ সক্ষমতা ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান—সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এই জায়গায় বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে। তুরস্ক, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে রপ্তানি করা পোশাকের গড় মূল্য বেড়েছে। অর্থাৎ এসব দেশ শুধু বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে না, তুলনামূলকভাবে বেশি মূল্যেও পণ্য বিক্রি করতে পারছে।
চীনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ইউরোপীয় বাজারে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে কম হলেও মোট রপ্তানি আয় অনেক বেশি। এর অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখনো তুলনামূলক কম মূল্য সংযোজনের পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দাম কম রাখার মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ফজলে শামীম এহসানের বক্তব্যেও এ বাস্তবতার ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁর মতে, চীন যখন ইউরোপে আগ্রাসী বিপণন শুরু করেছে, তখন দেশটির সরকার ও ব্যাংকগুলো শিল্পকে সহায়তা করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং ঋণসংকটের কারণে অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়নি। ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের প্রতিযোগিতামূলক দাম দেওয়াও কঠিন হয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, শুধু কম দামে পোশাক উৎপাদন করে ইউরোপের বাজারে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ একই বাজারে আরও সংগঠিতভাবে এগোচ্ছে। কারও আছে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কারও বাণিজ্যিক সুবিধা, কারও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সহায়তা। বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ভিত্তি তাই শুধু সস্তা শ্রমের ওপর থাকলে চলবে না।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যসুবিধা পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে ভারতসহ প্রতিযোগী দেশগুলো যদি ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে আরও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।
এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি ধরে রাখতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যাংকঋণের সহজলভ্যতা এবং দ্রুত বন্দর ও কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য, কৃত্রিম তন্তু ও নন-কটন পোশাকের উৎপাদন বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের পরিমাণ বড় হলেও মূল্য সংযোজন এখনো তুলনামূলক কম। প্রতি কেজি পোশাকের দাম যেখানে বাংলাদেশের ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরো, সেখানে চীনের ১৯ দশমিক ৮৩ ইউরো—এই ব্যবধানই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের একটি বড় ছবি তুলে ধরে।
ইউরোপের বাজারে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ রপ্তানি পতন তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে একটি বড় সতর্কসংকেত। বাজারে চাহিদা কমেছে—এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। কিন্তু একই সময়ে প্রতিযোগীরা যদি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সমস্যার একটি অংশ দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার মধ্যেও খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। সেই খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু বেশি পোশাক রপ্তানি করাই যথেষ্ট নয়; বেশি মূল্য, বেশি দক্ষতা এবং বেশি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জন করাই হয়ে উঠছে টিকে থাকার শর্ত। ইউরোপের সর্বশেষ পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।