দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শেষ সদস্যদেরও প্রত্যাহার করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার এক দিন আগেই মঙ্গলবার ইরাকে থাকা শেষ মার্কিন সেনারা দেশটি ছেড়ে গেছেন বলে জানিয়েছে ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক উপস্থিতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।
ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, এখন ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সেনা নেই। তাঁর ভাষ্য, বিদেশি বাহিনীর অনুপস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় সক্ষম ইরাকি বাহিনী।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে ওয়াশিংটন ও বাগদাদের মধ্যে ২০২৪ সালে একটি সমঝোতা হয়েছিল। সে সময় ইরাকে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা ছিল। গত বছর তাঁদের বেশির ভাগই প্রত্যাহার করা হয়। পরে আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলগুলোতে কিছু মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। তাঁদের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির শুরু ২০০৩ সালে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী দেশটিতে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সাদ্দামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর একটি বড় অংশ ২০১১ সালে প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে আবারও মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনায় ইরাকে একদিকে যেমন সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি বলেছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে দেশটির জন্য নতুন দিনের সূচনা হয়েছে। তাঁর মতে, এর ফলে ইরাক বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি পুরো ভূখণ্ডের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে।
ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে। ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি ঘটনাটিকে ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, এর মধ্য দিয়ে ইরাকের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
তবে দেশটির সব মহলে একই ধরনের স্বস্তি নেই। ফালুজা অঞ্চলের একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর মনে করেন, নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য ইরাক এখনো প্রস্তুত নয়। তাঁর মতে, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ফলে যে নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে এসব গোষ্ঠীর প্রভাবের বিপরীতে একটি সামরিক ভারসাম্য তৈরি করেছিল বলে মনে করেন কিছু বিশ্লেষক।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের প্রস্থান কৌশলগতভাবে ইরানের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, এর ফলে ইরাক থেকে এমন একটি সামরিক শক্তি সরে গেল, যারা বহু বছর ধরে দেশটিতে তেহরানের প্রভাবের বিপরীতে ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতেও ইরাকের ভূখণ্ড ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। চলতি মাসে ইরাক থেকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ইরান-সংঘাতের সময় নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাকের দুই দশকের সামরিক অধ্যায়ের অবসান হলেও দেশটির সামনে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা কাঠামো, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে।![]()