বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক জালিয়াতির ঘটনায় আলোচিত উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টসের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ চার পরিচালক একযোগে পদত্যাগ করেছেন। রোববার তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংকে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে বর্তমানে মাত্র দুজন পরিচালক রয়েছেন।
পদত্যাগ করা চারজন হলেন উত্তরা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ও এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুখতার হোসেন, স্বতন্ত্র পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. নিয়ামুল কবির, স্বতন্ত্র পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এফসিএস এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়ালি উল্লাহ।
এর মধ্যে ওয়ালি উল্লাহ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উত্তরা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। অন্যদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। তখন এমডি ছাড়া চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং উত্তরা গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা বা সিএফওর সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের পর্ষদ গঠন করা হয়।
রোববার চার পরিচালকের পদত্যাগের পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন স্বতন্ত্র পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আজম এবং উত্তরা গ্রুপের সিএফও ও পরিচালক মাহবুব আলম এফসিএমএ। ফলে পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উত্তরা ফাইন্যান্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের একটি পক্ষ মিলে পদত্যাগকারী পরিচালকদের ওপর নানা ধরনের অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বা পদত্যাগকারী পরিচালকদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনায় ২০২২ সালে উত্তরা ফাইন্যান্সের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতের অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্যোক্তা উত্তরা গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচ পরিচালককে অপসারণ করা হয়।
তখন অপসারিত পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান রাশেদুল হাসান, উত্তরা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, তাঁর ভাই ও পরিচালক মুজিবুর রহমান এবং উত্তরা পরিবারের সদস্য ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জাকিয়া রহমান ও নাঈমুর রহমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। ২০১৯ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে পরিচালিত পরিদর্শনে আমানতের অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা না করে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার, কলমানির অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, অগ্রিম ও প্রি-পেমেন্টের নামে নিয়ম না মেনে অর্থ বের করে নেওয়া এবং ভুয়া স্থায়ী আমানতের রসিদের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার মতো অনিয়ম শনাক্ত করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব অনিয়মের মাধ্যমে মোট প্রায় ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার আর্থিক অসংগতি ও অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। এসব ঘটনার পর উত্তরা ফাইন্যান্সের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম শামসুল আরেফিনকে ২০২২ সালের জুনে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে একের পর এক পরিবর্তন এবং নতুন করে চার পরিচালকের পদত্যাগের ঘটনায় উত্তরা ফাইন্যান্সের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী পর্ষদ কীভাবে গঠন করা হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।![]()