এই সমাজে সব ই খ্যাত হয়ে যায় ।
এক কালের ভালো নাস্তা ,শিংগাড়া বা সাদা নুডুলস এখন খ্যাত ;তেমনই ড্রেসের লেনথ,প্যান্টের ঘের,চুলের কাট অথবা বাসার আসবাস ।
মানুষ ও খ্যাত হয়ে যায় !!যায়ই তো ..
ব্যাকডেটেড শব্দ টা তো খ্যাত এর ই অন্য নাম ।
দিন দিন খ্যাত হয়ে যাচ্ছি …
হাল ফ্যাশন এর কিছুই তেমন জানি না ।
দর্জি কে জামা বানাতে পাঠিয়ে দেই,ফোন দিয়ে ডিজাইন জানতে চাইলে ঝামেলা এড়াতে তাড়াতাড়ারি বলে উঠি “এখন যা চলতেছে তাই বানান “ওইপাশ থেকে হেসে বলে আপা এখন তো অনেক রকমই চলে,আপনি পড়তে পারবেন না ।
আমার দর্জির এই ডায়লগ অবশ্য কম পক্ষে ১০ বছর ধরেই শুনছি “আপা এই ডিজাইন দিয়েন না,পরে পরতে পারবেন না “আগে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অসুবিধা কি জানতে চাইতাম,আবার অন্য ডিজাইন নিয়ে বসতাম,মোটামুটি ১ ঘন্টা তো লাগতোই রিয়াজুল ভাই এর সাথে আলাপ আলোচনায় ।
সেটা এখন ১ মিনিট এ সেরে ফেলি
“আপা ড্রেসের গলা কি?”
আমি:ওই যে আমি যেটা পড়ি
ওই
ওই
ওই…
জীবন টাই ওই ওই হয়ে গেছে
মনে হয় কত কাল ধরে ওই ওই একই কাজ করে যাচ্ছি !!
চুল কাটাতে গেলে আর একচুল এদিক ওদিক হলে বিরক্ত হই না ।
বরং বলি যা ইচ্ছা কাটেন,বড় তো হয়েই যাবে,তবে গতবার এই করতে দিয়ে এমন এক অবস্থা হলো যে নিজের বাসার গেটে আটকে দিলো দারোয়ান!
কোন ফ্লোরে যাবো জানতে চায়;পুরনো বয়স্ক দারোয়ান ,এটা অবশ্য আমার “যেমন খুশি তেমন কাটো “হেয়ার কাট এর দোষ নাকি দাওয়ান চাচার চশমা বদলাতে হবে ,সেই কনক্লুশনে এখনো আসতে পারি নাই ।
গাছ ও খ্যাত হয়ে যায়..
একসময় মফস্বল বাড়ির উঠানে অথবা গেটের গা বেয়ে যে ছিটেফোঁটা পাতাবাহার স্বগর্বে দাড়িয়ে থাকত আজ তা খ্যাত,সেখানে বিদেশি নানা জাতের গাছের দৌরাত্ম!
পায়েস, সেমাই তো সেই কবেই খ্যাত হয়ে গেছে,কাস্টার্ড ও খ্যাতের পথে সেখানে জায়গা নিয়েছে নানা রকমের বিদেশি ডেজার্ট,খেতে খুব ভালো তবে নাম মনে রাখাই কঠিন!
আসবাস মনে হয় সব থেকে দ্রুত খ্যাত হয়ে যায়,আম্মার ঘরের কারুকাজ করা কাঠের আলমিরা তো আমার সেই ছোটবেলাতেই খ্যাতের তালিকায় চলে গেল,অথচ এখনও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখি আর ভাবি কিভাবে সম্ভব ছিলো কোন আধুনিক কাটার ব্যবহার না করে এতো নিখুঁত কারুকাজ!!কাঠ মিস্ত্রিদের বড় মাপের শিল্পী মনে হয় এইসব আগের দিনের আসবাস দেখলে,ওগুলো অবশ্য এন্টিক হিসেবে কিছুটা কদর পায় ।
সঙ্গীত ও সময় ও বয়স ভেদে খ্যাত হতে হয়;কি নিষ্ঠুর!!
সাজগোজ সেটাও খ্যাত হওয়া থেকে রেহাই নাই,আগে নতুন বউ এর কপালের সাদা লাল আলপনা,যে সাজাতো তার চোখের থেকেও মনোযোগ দিয়ে দেখার চোখ থাকত তাঁকে ভিড় করে ,ওগুলো তো খ্যাত হয়েছে কোন কালেই আজকাল বউ সাজেও নো মেকআপ লুক কিন্তু আগের আমলের আলপোনায় লাগতো ২০ টাকার কুমকুম,এখন নো মেকআপ লুক এ ২০ হাজার দিয়ে ৫/৬ ঘন্টা সময় নিয়ে বউ বাড়ি আসলে বোঝা যায় না কোনটা বউ,সে যাই হোক যার যা শখ ।
ডাক্তারি বিদ্যা ও খ্যাত হয়ে যায়,আগে জ্বর এলে যেমন গোসল বন্ধ,ভাত বন্ধ ওগুলো এখন সব ই খ্যাত,এখন জ্বর বেশি মানেই সোজা শাওয়ার এর নিচে।
আর খ্যাত হয় মানুষের নাম!
জন্মালে বাবা, মা ,দাদা ,নানা শখ করে নাম রাখেন,একটু বড় হতেই যার নাম স্বয়ং সেই নাম নিয়ে বিব্রত বোধ করেন !
আমার নাম টা যেমন ভয়ানক খ্যাত,বড় দুই বোন এর নামের সাথে মিলাতে যেয়ে আব্বু যে ১২ বছর পিছনে চলে গেল ;একবার ভাবলো ও না ।
এই কারণেই হয়তো ফেসবুকে কাব্যময় নানা নামের প্রোফাইল থাকে !নিজেকে একটু হালকা করার চেষ্টা,আকিকা দিয়ে নাম পরিবর্তন বা আইনের মাধ্যমের জটিলতা এড়ানো;ভালোই ।
আগের দিনের প্রেম/ভালোবাসা ও আজকে খ্যাত,ভালোবাসার আধুনিক যে ধারণায় বিশ্বাসী মোটামুটি ৮০ পারসেন্ট ছেলেমেয়ে ,আমাদের বাবা মা রা ওই ধারণা বুঝতে গেলে জেন জি স্ল্যাং এর মতো লাগবে উনাদের কাছে!আমরা কিছুটা চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে বাচ্চাদের সম্পর্কের পারদ কিছুটা অনুমান করা যায়
তবে একটা কথা জোর দিয়েই বলতে চাই সব কিছু খ্যাত হোক আপত্তি নাই শুধু মন মানসিকতা আধুনিক রাখা জরুরি;বাবা মা দের জেনারেশন এ উনারা যেভাবে চলতেন ওটা কেও উনাদের সময়ের প্রেক্ষিতে বোঝার চেষ্টা করা আবার সন্তান যে ভাবে চিন্তা করে সেটাও তার বয়স,প্রেক্ষিত চিন্তা করে বোঝার চেষ্টা করাই আধুনিকতা ।
আমার ধর্ম,আমার বিশ্বাস,আমার দল,আমার রীতি,আমার সংস্কার,আমার সংস্কৃতি,আমার মতই একমাত্র সঠিক ,এই ভাবনা থেকে বের হয়ে অন্যের টা হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়ার মতো খ্যাত মানসিকতা থেকে বের হওয়া দরকার ।
মন কে কোনভাবেই খ্যাত হতে দেয়া যাবে না ,নিজের জানা বোঝার বাইরেও অন্য ধারণা কে ধারণ করার মতো মানসিকতা রাখা খুব জরুরি ।![]()