মিলি সুলতানা
ছোট্টশিশু তানি যখন রাতে কাঁদতো পিতা খাজা জাভেদ কায়সারের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতো। আর জাভেদ বিরক্ত হয়ে বলতেন,”ইশ এই জঞ্জালটাকে সরাও তো”!! ম*দ্যপ জুয়াড়ি জাভেদ কায়সারের সাথে উপমহাদেশের রত্ন রুনা লায়লার বৈবাহিক জীবন ছিল অশান্তিতে ভরা। ১৯৭৮ সালে ভালোবেসে জাভেদকে বিয়ে করেন রুনা। তাদের দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি হয় আইন আদালতের মাধ্যমে। দেশের প্রথিতযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার রাবেয়া ভুঁইয়া রুনা লায়লার পক্ষ হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা পরিচালনা করেন। দুইবছর ধরে মামলা চলেছিল। রুনা লায়লা আদালতে ইংরেজি ও বাংলা মিশিয়ে জবানবন্দী দেন। সেদিন আদালতে দাঁড়িয়ে রুনা লায়লা তাঁর জবানবন্দীতে অনেক অজানা কথা বলেছিলেন। যা শুনে সবাই নড়েচড়ে বসেছিলেন এবং যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিলেন। উপমহাদেশের এতবড় গায়িকা কিন্তু নিয়তির কাছে তিনি ছিলেন অসহায়।
খাজা জাভেদ কায়সারের লেখা প্রেমপত্র যখন আদালতে উত্থাপন করা হলে রুনা কান্নায় ভেঙে পড়েন। যখন জাভেদকে বিয়ে করেন তখন বলেছিলেন তিনি আমেরিকা থেকে কম্পিউটার সায়েন্সের উপর ডিগ্রি নিয়েছেন। কিন্তু বিয়ের পর রুনা দেখলেন জাভেদ পেশাগতভাবে তেমন কিছুই করছেন না। সারাদিন বাইরে কাটাতেন। তার অগণিত গার্লফ্রেন্ড ছিল। মদ সিগারেটের জন্য রুনার কাছে টাকা চাইতে লাগলেন। রুনার বাবা এমদাদ আলী মেয়ে জামাইয়ের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু তখন জাভেদ জানালেন, তিনি কম্পিউটার সায়েন্সের সার্টিফিকেট শো করতে পারবেন না। অর্থাৎ পূর্বে তিনি তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মিথ্যে বলেছিলেন। প্রচন্ড হতাশ হন রুনা বাবা মা। বিয়ের পর রুনা আর তাঁর মা বাবা দেখলেন জাভেদ আসলে বেকার। তার হাত খরচা রুনাই চালাতে লাগলেন। রুনা প্লেব্যাক করতে স্টুডিওতে গেলে বাসায় ফিরতে কখনো রাত হয়ে যেতো।
জাভেদ কায়সার রুনাকে সন্দেহ করতে লাগলেন। এমনকি শারীরিক নির্যাতনও করতেন। রুনা বার বার তাকে বোঝাতে চেয়েছেন যে কারো সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক নেই। কিন্তু জাভেদ রুনার কথা বিশ্বাস করতেন না। মুখ বুঁজে ম*দ্যপ ল*ম্পট জাভেদের নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছিলেন। রুনার ভাষ্যমতে জাভেদ কখনো তার শিশুকন্যা তানিকে পিতৃস্নেহ দেননি। মেয়ের ভরনপোষণ দেয়া তো দুরের কথা। প্রতিমাসে হাত খরচা বাবদ দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা দাবি করতেন। রুনা কষ্ট করে হলেও তার হাত খরচা দিতেন। জাভেদ রুনার কাছ থেকে টাকা নিয়ে জুয়া খেলতেন। রুনা জাভেদের মায়ের কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। জাভেদের জুয়াদোষ নারীদোষ বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং আরও বেড়ে গেল। এভাবে মাসের পর মাস চলতে লাগলো। জাভেদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রুনা আদালতে ডিভোর্সের আবেদন করেন। দুই বছর ধরে মামলাটি চলেছিল। পাঁচ বছর দুঃসহ যন্ত্রণা সয়েছেন রুনা। খাজা জাভেদের কায়সারের সঙ্গে আপোষের মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি ঘটে। রুনা জাভেদের বিয়ের দেনমোহর ছিল এক লক্ষ টাকা। রুনার বাবা মা বিয়েতে মেয়েকে প্রচুর সোনার গহনা দিয়েছেন। রুনার গহনার উপরও জাভেদের কুনজর ছিল।
আদালতের রায় রুনার পক্ষে যায়। তানি লায়লার বয়স ১৮ হওয়া অবধি রুনা মেয়ের কাস্টোডি পান। এরপর রুনা লায়লা দ্বিতীয় বিয়ে করেন সুইস নাগরিক ব্যবসায়ী রন ড্যানিয়েল পিলনিককে। কিন্তু এখানেও দাম্পত্য অশান্তি চরমে ওঠে। শোনা যায়,ড্যানিয়েল রুনাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। ড্যানিয়েলের কবল থেকে নিষ্কৃতি পেতে রুনা এবারও আদালতের শরণাপন্ন হন। ইসলামি রীতি অনুযায়ী বিয়ে করতে অস্বীকৃতি ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এনে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার জন্য দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে ঢাকার একটি আদালত রন ড্যানিয়েল পিলনিকের ওপর রুনা লায়লার বাড়িতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কথিত আছে, ড্যানিয়েল পিলনিক রুনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন যে রুনার সঙ্গে উঁচুতলার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সখ্যতা ছিল। যা স্বামী হিসেবে পিলনিকের পছন্দ ছিলোনা। রুনার বাসায় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অবাধ যাতায়াত ছিল। তিনি কখনো রুনার গায়ে হাত তোলেননি। তবে রুনাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন চলাফেরা সংযত করতে। কিন্তু রুনা লায়লা তার কথা শুনতেন না।
ড্যানিয়েল পিলনিক রুনার মা অনীতা সেন ওরফে আমিনা লায়লা সম্পর্কে বলেছেন তিনি ড্যানিয়েলকে পছন্দ করেননি। আমিনা চাইতেন না ড্যানিয়েল পিলনিক রুনার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করুক। তবে রুনা লায়লা ড্যানিয়েল পিলনিকের সব অভিযোগ মনগড়া ও কল্পনাপ্রসূত আখ্যা দেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেন। এটা নিয়ে তৎকালীন সিনে পত্রিকাগুলোতে রঙিন ছবিসহ বহু রসালো কাহিনী ছাপা হয়েছে। পরবর্তীতে পিলনিক দুবাই-ভিত্তিক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কথিত আছে, রুনা তৃতীয় বিয়ে করেন একজন সংসদ সদস্যকে। কিন্তু সেই বিয়েও টেকেনি। এরপর তার বায়োপিক চাষী নজরুল ইসলামের “শিল্পী” সিনেমায় অভিনয় করতে গিয়ে চলচ্চিত্রের মোস্ট হ্যান্ডসাম নায়ক আলমগীরের প্রেমে পড়েন এবং তাঁরা ঘর বাঁধেন। বর্তমানে তাঁরা সুখে আছেন। আমরা কিংবদন্তি রুনা লায়লার সুস্থতা এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি।