ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা পরিমাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কেপিআই কাঠামোকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি-সিইও মাসরুর আরেফিন। তবে তাঁর মতে, এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে এমডিদের দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া, দুর্বল ব্যাংকের জন্য বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে এমডির অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেওয়ার ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কাঠামোয় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের কর্মদক্ষতা শুধু মুনাফার ভিত্তিতে পরিমাপ না করে মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতি, সম্পদের গুণগত মান, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকসেবা এবং মুনাফা—এই পাঁচটি বড় ক্ষেত্রের ওপর মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোট ১০০ নম্বরের এই কাঠামোয় মূলধন ও তারল্য এবং সম্পদের গুণগত মানে ২৫ নম্বর করে, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে ২৫, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকসেবায় ১৫ এবং মুনাফায় ১০ নম্বর রাখা হয়েছে।
মাসরুর আরেফিনের মতে, ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়াতে লিখিত, পরিমাপযোগ্য ও স্বচ্ছ কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের কাঠামো চালু হলে ব্যাংকের এমডিদের কাজের ফলাফল পরিমাপের একটি অভিন্ন ভিত্তি তৈরি হবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ, ঋণ আদায়, সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, তারল্য ও গ্রাহকসেবার মতো বিষয়কে মূল্যায়নের আওতায় আনা হলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা আরও ফলাফলভিত্তিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে তাঁর প্রধান উদ্বেগ এমডিদের কর্তৃত্ব নিয়ে। একটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য যদি এমডিকে দায়বদ্ধ করা হয়, তাহলে সেই ফলাফল অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও তাঁকে দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট না থাকলে শুধু এমডির কর্মদক্ষতা দিয়ে ব্যাংকের সামগ্রিক ফলাফল বিচার করা ন্যায্য হবে না।
বিশেষ করে ঋণ অনুমোদন, ঋণ আদায়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমডির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যদি সীমিত থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সূচকে খারাপ ফলাফলের সম্পূর্ণ দায় তাঁর ওপর দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। মাসরুর আরেফিনের বক্তব্যে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহির বিষয়টিও একই সঙ্গে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, এমডিদের জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি পর্ষদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাঠামোয় দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কোনো এমডি এমন ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে পারেন, যেখানে তাঁর যোগদানের আগেই বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি কিংবা সুশাসনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এসব পুরোনো সমস্যা কয়েক মাসের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়।
এ কারণেই একই ধরনের বেঞ্চমার্ক সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না করার পক্ষে মত দিয়েছেন এবিবি চেয়ারম্যান। তাঁর যুক্তি হলো, কোনো এমডি যে অবস্থায় একটি ব্যাংকের দায়িত্ব গ্রহণ করছেন এবং সেই ব্যাংকের পুরোনো সমস্যাগুলোর কতটা তাঁর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে—মূল্যায়নের সময় এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ভালো পেশাদার ব্যাংকাররা দুর্বল ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী হতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাঠামো অনুযায়ী, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা এমডিদের প্রথম মূল্যায়ন পর্ব হবে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। এরপর ছয় মাস অন্তর কর্মদক্ষতা পর্যালোচনা হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে আগের সময়ের কর্মদক্ষতাকে ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
নতুন কাঠামোয় কোনো কেপিআইয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যের অন্তত ৫০ শতাংশ অর্জন না হলে ওই সূচকে নম্বর পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ফলাফল হলে এমডির মেয়াদ না বাড়ানো কিংবা তাঁকে অপসারণের জন্য পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
মাসরুর আরেফিন মনে করেন, নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে অভিজ্ঞ ব্যাংক এমডিদের সঙ্গে আরও আলোচনা হলে এটি আরও বাস্তবসম্মত হতে পারত। তাঁর দৃষ্টিতে, জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতা পরিমাপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই; মূল বিষয় হলো সেই মূল্যায়ন যেন ব্যাংকের বাস্তব অবস্থা, এমডির কর্তৃত্ব এবং দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের সংকট মোকাবিলায় নতুন কেপিআই কাঠামো তাই শুধু এমডিদের মূল্যায়নের ব্যবস্থা নয়, বরং ব্যাংক পরিচালনায় দায়িত্ব ও জবাবদিহির সম্পর্ক নতুন করে নির্ধারণের একটি উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার ওপর।![]()