নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের কৃষিতে সংখ্যার দিক থেকে এখনো ক্ষুদ্র কৃষকেরই আধিপত্য। খাদ্য উৎপাদনে তাদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। তবে জমির স্বল্পতা, সীমিত পুঁজি, আধুনিক প্রযুক্তিতে কম প্রবেশাধিকার এবং বাজারে দরকষাকষির দুর্বলতার কারণে অধিকাংশ ক্ষুদ্র কৃষক এখনো কম আয়ের ফসল ও সীমিত উৎপাদন কাঠামোর মধ্যেই আটকে রয়েছেন। ফলে কৃষিতে শ্রম দিলেও বৃহৎ কৃষকের তুলনায় তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় দুটিই কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা জরিপ ২০২৫’-এর তথ্যেও এ চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট খাদ্য উৎপাদকের ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক। অর্থাৎ কৃষির বড় একটি অংশ এখনো ক্ষুদ্র খামারভিত্তিক। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ক্ষুদ্র কৃষকের হার সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে, ৫৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। এরপর রংপুরে এ হার ৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। বিপরীতে সিলেট একমাত্র বিভাগ, যেখানে বৃহৎ কৃষকের সংখ্যা ক্ষুদ্র কৃষকের চেয়ে বেশি।
কৃষিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে ক্ষুদ্র কৃষকরা। বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, দেশের কৃষিতে সব খাত মিলিয়ে প্রতি শ্রম দিবসে গড় উৎপাদন মূল্য ১ হাজার ৮৬৮ টাকা। ক্ষুদ্র কৃষকের ক্ষেত্রে এ মূল্য ১ হাজার ৪৯৪ টাকা। আর বৃহৎ কৃষকের ক্ষেত্রে তা ২ হাজার ৩০১ টাকা। অর্থাৎ একই এক শ্রম দিবসে বৃহৎ কৃষকের তুলনায় ক্ষুদ্র কৃষকের উৎপাদন মূল্য প্রায় ৮০০ টাকা কম।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ক্ষুদ্র কৃষকের জমি ও পুঁজি দুটিই কম। ফলে তাদের বিনিয়োগের সক্ষমতা সীমিত। অধিকাংশ কৃষক প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার মধ্যে থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পান না। করলেও এর পরিমাণ কম থাকে। এর প্রভাব পড়ে উৎপাদনে এবং শেষ পর্যন্ত কৃষকের আয়েও।
তার ভাষ্য, ক্ষুদ্র কৃষকের বড় অংশ সারা বছর নিজেদের শ্রম কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত সুযোগও পান না। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে ভূমি সংস্কারের পাশাপাশি জমি একত্র করে আধুনিক চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষকদের শুধু শস্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষি ও কৃষি-বহির্ভূত বিভিন্ন গ্রামীণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। এতে তাদের আয় ও জীবনমান বাড়ানো সম্ভব।
ড. জাহাঙ্গীর আলমের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রায় ৯২ শতাংশ কৃষকই ছোট কৃষক, যাদের জমির পরিমাণ আড়াই একরের কম। সময়ের সঙ্গে এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। অন্যদিকে বড় ও মাঝারি কৃষকের সংখ্যা কমছে। ফলে খণ্ডিত জমিতে উৎপাদন পরিচালনার সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। তার মতে, জমির কনসলিডেশন বা একত্র ব্যবস্থাপনা, আধুনিক চাষাবাদ এবং কৃষকের বিকল্প আয়মূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।![]()
ক্ষুদ্র কৃষকের আয় কম থাকার আরেকটি কারণ হলো উৎপাদনের ধরন। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, মৌসুমভিত্তিক ফসল—ধান, গম, ভুট্টা, আলু ও সবজিসহ অন্যান্য ফসলে—প্রতি শ্রম দিবসে উৎপাদন মূল্য ২ হাজার ৬৬৪ টাকা। গ্রামে এ মূল্য ২ হাজার ৬৯০ টাকা এবং শহরে ২ হাজার ৪৭২ টাকা। এ ধরনের ফসলে বার্ষিক জাতীয় গড় আয় ৯ হাজার ৮৯৪ টাকা।
অন্যদিকে স্থায়ী ফসল বা বহুবর্ষজীবী বাগান ও ফলদ ফসলে প্রতি শ্রম দিবসে উৎপাদন মূল্য ৬ হাজার ৫৩০ টাকা। এ খাতে বার্ষিক গড় নিট মুনাফা ১৬ হাজার ৮৮৯ টাকা। অর্থাৎ কম মূল্য সংযোজনকারী প্রচলিত ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ক্ষুদ্র কৃষকের আয় বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ধান বা অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে কৃষকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়। ফল, সবজি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী কর্মকাণ্ডে ক্ষুদ্র কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে হবে।
বাংলাদেশে কৃষিজমির পরিমাণ কমে আসায় এ প্রয়োজন আরও তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০-৯১ থেকে ২০২১-২২ সময়কালে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে দশমিক ৩ শতাংশ হারে চাষযোগ্য জমি কমেছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে বেশি উৎপাদন এবং একই সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়ানো—দুই লক্ষ্যই অর্জন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের উৎপাদনশীলতাও বড় প্রশ্ন হয়ে আছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি ধানের উৎপাদন ছিল ৪ দশমিক ৮২ টন। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ১০ দশমিক ৯২ টন, যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৪১ টন, তুরস্কে ৮ দশমিক ৯৩ টন এবং মিসরে ৮ দশমিক ৪৪ টন। পেরুতে ৮ দশমিক ২১, মরক্কোয় ৭ দশমিক ৮৬, ব্রাজিলে ৭ দশমিক ২৩ এবং চীনে ৭ দশমিক ১৫ টন ধান উৎপাদন হয়েছে প্রতি হেক্টরে। জাপানে এ উৎপাদন ৬ দশমিক ৮৭ টন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬ দশমিক ৮৫, ভিয়েতনামে ৬ দশমিক ১৬ এবং ইরানে ৫ দশমিক ৩২ টন।
উৎপাদনশীলতার এই ব্যবধানের পেছনে প্রযুক্তি ও কৃষি ব্যবস্থাপনার পার্থক্যও রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষি এখন দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। ড্রোন, স্মার্ট সেচ, উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি, ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় টেকসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে।
বাংলাদেশে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হলেও ক্ষুদ্র কৃষকের মধ্যে তা এখনো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। জমির আকার ছোট হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা অনেক কৃষকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ফলে যান্ত্রিকীকরণের সুবিধা পেতে তাদের দলগত বা সেবাভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত।
উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকেও বাংলাদেশের কৃষক চাপের মধ্যে রয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে আবাদযোগ্য জমির প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৩৭ দশমিক ৬ কেজি সার ব্যবহার হয়েছে। বাংলাদেশে একই সময়ে হেক্টরপ্রতি গড়ে সার ব্যবহার হয়েছে ৩৯২ কেজি। অর্থাৎ বিশ্ব গড়ের তুলনায় বাংলাদেশে সার ব্যবহারের মাত্রা প্রায় তিন গুণ।
কীটনাশকের ব্যবহারও বেড়েছে। বিবিএসের হিসাবে, ২০১৫ সালে দেশে ৩৫ হাজার ৫২৩ টন কীটনাশক ব্যবহার হয়েছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৮৩২ টনে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে আবাদযোগ্য কৃষিজমি ৮৮ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর। এ হিসাবে হেক্টরপ্রতি কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ দশমিক ৬২ কেজি।
তবে ক্ষুদ্র কৃষকের উৎপাদনশীলতা কম হওয়ার কারণ হিসেবে তাদের দক্ষতার ঘাটতিকেই দায়ী করা ঠিক নয় বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। বরং উৎপাদনের উপকরণ, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতাকেই বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন তারা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র কৃষক মানেই অদক্ষ কৃষক নয়। বিভিন্ন গবেষণায় ক্ষুদ্র কৃষকের দক্ষতার বিষয়টি তুলে ধরে ‘স্মল ইজ বিউটিফুল’ ধারণাও সামনে এসেছে। তার মতে, কৃষকের দক্ষতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয় উপকরণের প্রাপ্যতা এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের ওপর।
তিনি বলেন, একজন কৃষক যে সময়ে যে কৃষি উপকরণটি প্রয়োজন, সেটি যদি সময়মতো ও সহজে পান, তাহলে তাকে অদক্ষ বলা যায় না। একইভাবে উৎপাদিত পণ্যের বাজারও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বাজার পুরোপুরি প্রতিযোগিতামূলক নয়। ফলে বাজারের অনেক বিষয়ই কৃষকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যায় এবং সেগুলো তার উৎপাদন ও আয়ে প্রভাব ফেলে।
ক্ষুদ্র কৃষকের অন্যতম বড় সমস্যা হলো অল্প পরিমাণে কৃষি উপকরণ কেনা। ফলে বড় ক্রেতার মতো দরকষাকষির সুযোগ তাদের থাকে না। একই উপকরণ তাদের তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে হয়। আবার উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সময়ও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। অল্প পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করায় বাজারে কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা কম থাকে। ফলে একদিকে বেশি দামে উপকরণ কিনতে হয়, অন্যদিকে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়।
এ অবস্থায় কৃষি উৎপাদনের খরচ কমানো এবং কৃষকের বাজারক্ষমতা বাড়াতে কৃষক সংগঠন, উৎপাদক গোষ্ঠী ও দলগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কৃষকরা যদি সম্মিলিতভাবে কৃষি উপকরণ কিনতে পারেন, তাহলে পাইকারি পর্যায়ে দরকষাকষির সুযোগ বাড়বে। একইভাবে উৎপাদিত পণ্য একত্র করে বাজারজাত করা গেলে পরিবহন ও লেনদেন ব্যয় কমার পাশাপাশি বিক্রয়মূল্য নিয়েও ভালো দরকষাকষি করা সম্ভব হবে।![]()
সামগ্রিকভাবে দেশের ক্ষুদ্র কৃষককে শুধু খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র পাওয়া যাবে না। জমির সীমাবদ্ধতা, উৎপাদন ব্যয়, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, বাজার কাঠামো এবং কৃষি কর্মকাণ্ডের বৈচিত্র্য—সবকিছু মিলিয়েই তাদের আয় নির্ধারিত হচ্ছে। তাই ক্ষুদ্র কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর নীতি শুধু বেশি সার, বীজ বা কৃষিঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
জমির খণ্ডিত ব্যবহার কমানো, কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের জন্য যৌথ বা সেবাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, উন্নত প্রযুক্তির বিস্তার, উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী কৃষিতে বিনিয়োগ, কৃষক সংগঠন শক্তিশালী করা এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারসংযোগ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে উপকরণ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারেও পরিবর্তন আনতে হবে।
কারণ দেশের খাদ্য নিরাপত্তার বড় দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই ক্ষুদ্র কৃষক যদি কম উৎপাদনশীলতা ও কম আয়ের চক্রে আটকে থাকেন, তাহলে কৃষির সামগ্রিক অগ্রগতিও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। কৃষিকে শুধু উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, ক্ষুদ্র কৃষকের আয় ও জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।