১৯৮৫ সালের জানুয়ারী মাস। জয়শ্রী কবির তাঁর মোহাম্মদপুরের বাসায় চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের ডাকলেন। সবাই দেখলো “সুর্যকন্যার” জয়শ্রীর বেহাল দশা। রূপ লাবণ্যহীন মুখশ্রীর রোগাটে এক জয়শ্রী বাঁচার আকুলতায় ভেঙে পড়েছেন। হরিণী টানাটানা চোখ দুটো প্রায় কোঠরাগত। রূপালী পর্দার কমলার কোয়ার মতো ঠোঁট দুটো শুকনো ফ্যাকাশে। একটু পরপর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাচ্ছিলেন। ধনুকের মতো বাঁকানো ভ্রু যুগল ক্রমশ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিলো। কণ্ঠস্বর জড়িয়ে আসছিলো জয়শ্রীর। ফটোগ্রাফারের ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে জয়শ্রী চোখের দৃষ্টি নিচে নামালেন। সাংবাদিকদের কেউ কেউ জয়শ্রীর করুণ দশা দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। তারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না “সীমানা পেরিয়ে”এর সেই লাস্যময়ী রুপনন্দিনী জয়শ্রী এমন দশা!! যা কল্পনাও করা যায়না।
সেদিন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে জয়শ্রী তাঁর বক্তব্যে যা যা ছিল তা ছিল শিউরে উঠার মতো। জয়শ্রীর সাথে আলমগীর কবিরের দাম্পত্য অশান্তি শুরু হয় “মহানায়ক” নিয়ে। এই ছবিতে জয়শ্রী অভিনয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আলমগীর কবির জয়শ্রীকে কাস্ট না করে কলকাতা থেকে জয়শ্রীর ছোটবোন সুমিতা চৌধুরীকে কাস্ট করেন। যা জয়শ্রী মেনে নিতে পারেননি। তিনি কবিরকে চাপ দেন সুমিতাকে বাদ দিতে। কিন্তু কবির তার কথা শোনেননি। সেদিন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে জয়শ্রী বলেছিলেন,”আমি বাঁচতে চাই। আমি মারাত্মক অসুস্থ। আমি আশ্রয়হীনা, অনাহারে বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমি একজন বিদেশি নারী। বিয়ে করে এদেশের আকাশ মাটি আলো বাতাসের সঙ্গে মিশে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভয়ংকর চক্রান্তের শিকার হয়েছি আমি। আমাকে আপনারা বাঁচান। আমি আমার একমাত্র সন্তান বাবুকে বুকে নিয়ে বাঁচতে চাই।
জয়শ্রীর প্রচন্ডভাবে মেন্টাল ব্রেক ডাউন হয়। স্বামী আলমগীর কবিরের সঙ্গে ছোটবোন সুমিতাকে জড়িয়ে নানান কথা শোনা যেতে লাগলো। এমনকি ‘মহানায়কের’ স্যুটিং লোকেশনে অভিনেতা বুলবুল আহমেদও কবিরের সঙ্গে সুমিতার ঢলাঢলি ভালোভাবে নেননি। জয়শ্রী তাঁর মা বোনদের উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলেন। কারণ মা বোনেরা তার সঙ্গে সবসময় বৈরী আচরণ করেছে। তাঁকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে যখন জয়শ্রী অসুস্থতার সময় মায়ের কাছে দুইবার আশ্রয়ের জন্য গিয়েছিলেন। এমনকি বোনরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। নিজেদের স্বার্থের জন্য তারা অনেক নিচে নেমে গিয়েছিলো। তাই যশ খ্যাতিহীনা জয়শ্রীকে তাদের কাছে “আপদ” মনে হয়েছিল। শুধুমাত্র বাবা ছিলেন জয়শ্রীর একমাত্র আপনজন। যখন বাবার মৃত্যু হয় তখন জয়শ্রীর পায়ের তলার মাটি সরে যায়। স্ট্রেস টেনশন থেকে তাঁর প্রচন্ড ব্যথা হতো। ছেলে লেনিনের জন্মের পর তার প্রায়ই তার ব্যথাটা উঠতো। তখন ব্যথা কমানোর জন্য তাঁকে পেথিড্রিন দেয়া হতো। এছাড়াও তিনি জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পেশেন্ট ছিলেন। তাঁদের পরামর্শ ছিল, জয়শ্রী যদি কাজে ব্যস্ত থাকেন তাহলে হয়তো ব্যথা চলে যাবে। কিন্তু কবির জয়শ্রীকে কাজ করতে দেননি। প্রভাব খাটিয়ে জয়শ্রীর কাজ করার সব পথ বন্ধ করে দেন। এমনকি একমাত্র সন্তান লেলিন কবির ওরফে বাবুকে জয়শ্রীর কাছ থেকে সরিয়ে ফেলেন।
জয়শ্রীকে মানসিক ভারসাম্যহীন প্রমাণ করার সকল উপায় তিনি ব্যবহার করেছেন আলমগীর কবির। তারও আগে স্ত্রী জয়শ্রীকে অন্য কোনো পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে দিতেন না। হাতে গোনা যে কয়টি সিনেমা জয়শ্রী করেছিলেন সেগুলো তিনি জোর করে করেছিলেন। কবিরের ভয়ে তিনি পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিতেন না। তাঁকে ঘরে বন্দী করে কাজে চলে যেতেন কবির। দরোজায় তালা মারা থাকতো। এমনকি জয়শ্রী কারো সঙ্গে যেন যোগাযোগ করতে না পারেন সেজন্য টেলিফোন সেট দরোজার বাইরের রেখে দিতেন। জয়শ্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন,”আলমগীর কবির কোনো ধোঁয়া তুলসীপাতা নন। যখন আমার বোন সুমিতার সঙ্গে দৃষ্টিকটু সম্পর্কে যুক্ত হন তখন আমি রাগে এগ্রেসিভ হয়ে উঠি। তখনই কবির পত্রিকায় বিবৃতি দেন আমি নাকি পেথিড্রিনে আসক্ত”!! এমন অবস্থায় কবিরের বাসা থেকে পালিয়ে যান জয়শ্রী। অভিনেত্রী সুমিতা দেবীর বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু এখানে সুমিতা দেবী ও ফরিদ উদ্দিন নীরদ মিলে একটা খেলা খেলেন। তারা জয়শ্রীকে দিয়ে তালাকনামায় সই করান। এরপর জয়শ্রী চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েন।
![]()