বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। মাননীয় সভাপতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয় আপনাকে জানাই অভিনন্দন। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমরা আপনাকে পূর্ণ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। একই সঙ্গে বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনলেনা বেয়ারবককেও তার সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। শুরুতেই আমি বাংলাদেশের সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের অবদানকে বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদ এবং আহতদের প্রতিও আমি জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ে আন্দোলন সংগ্রামের পথ ধরে হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু অবাধ এবং নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। আমি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। আমি বিশ্বাস করি আমরা বিশ্বাস করি জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। জাতিসংঘের এই বিশ্ব মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন।
একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি আপনাদের সামনে। গ্লোবালাইজেশনের এই সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তেই যা কিছুই ঘটুক প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানব সৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, সংকট, বৈষয়ক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। আমরা বিশ্বাস করি যেকোন সংঘাতের সমাধান, আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ যেখানে মরণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি তর্ক কূটনীতি শিক্ষা এবং মানবতা একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতি জাতিসংঘকে দেখতে চায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বিশ্ব শান্তির অন্তরায়। শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিশ্ব মানবতা এবং বিশ্ব শান্তির প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোন উদ্যোগের পক্ষে বাংলাদেশের পুনঃসমর্থন আমি আজ আবারো পুনর্ব্যক্ত করছি। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার সহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে। মাননীয় সভাপতি চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ৮১ তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য রিস্টোরিং ট্রাস্ট ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন আ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং সময় উপযোগী আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল পিসবিল্ডিং কমিশনের ভাইস চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতা সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ নারী শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারী প্রতিফলন।

বাংলাদেশ এ বছর উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণার ৪০ তম এবং ডারবেন ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনার ২৫ তম বার্ষিকী পালন করছে। অভিভাষণ প্রক্রিয়া মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিভাষীগণ তাদের জন্মভূমি এবং অভিভাষিত দেশ উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত নিরাপদ সুশৃঙ্খল অভিভাষণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিভাষীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে। মাননীয় সভাপতি, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচিত ১২ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ায় এই সমস্যা একমাত্র সমাধান। এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে। পাশাপাশি বাস্তুচিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্য আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। বাস্তুচিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। মাননীয় সভাপতি জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈষয়িক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশ তেমন ভূমিকা না রাখলেও বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। এমত অবস্থায় বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। সুতরাং ক্লাইমেট জাস্টিস জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কপ ৩১ এ আরো জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করছে। বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্মসূচি জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে। ক্লিন এনার্জি এবং সোলার এনার্জি ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশকে বন্যা করার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারাদেশে ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে। বাংলাদেশে বাংলাদেশে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে মিঠা পানি সরবরাহ প্রবাহ বৃদ্ধি বৃহৎ জলাশয়ের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহা পরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেছে। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ এবং দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদার করার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে সরকার ১৯৯২ সালের ওয়াটার কনভেনশন স্বাক্ষর করেছে। মাননীয় সভাপতি দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম খুন অপহরণ দুর্নীতি লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার রিকভারি রিস্টোরেশন এবং রি-কনস্ট্রাকশন অর্থাৎ থ্রি আর কৌশল অনুসরণ করছে। বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনা দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মযোগ্যে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন সহযোগিতার পাশে পেতে চায়। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগও তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে। মাননীয় সভাপতি মাননীয় সভাপতি দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তাতা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রধিকার দিচ্ছে। নারী উদ্যোক্ততা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণী পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবধারিত করেছে। শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয় সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে চায়। যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধি সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে এবং সেই লক্ষ্য পূরণে ইতিমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মাস কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই- হেলথ কার্ডের মতন বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। প্রতিটি পরিবারে নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ফ্যামিলি কার্ডকে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে। প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ইউনিভার্সাল কার্ড চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। মাননীয় সভাপতি চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড। এই প্রতিবাদের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৩৭ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে। সরকার আশা করে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে এবং একই সঙ্গে ২০৩০ সাল এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্পোর্টকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতন এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপি বাড়িয়ে ৫ শতাংশ উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। নৈতিক মানসম্য কর্মসূচি শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার উপরে জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণী থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ এবং পোশাক অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হচ্ছে। সরকার আশা করে এর ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর হার এবং স্কুলে শিক্ষার মান বাড়বে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে প্রথমবারের মতন স্পোর্টকে একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত জুন মাসে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারাদেশে মাসব্যাপী আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে ২ মিলিয়নেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। মাননীয় সভাপতি মাননীয় সভাপতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গড়বে আগামীর বিশ্বের ভবিষ্যৎ। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়োটেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে। আমরা চাই আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক। বাংলাদেশ উদ্ভাবন এবং মেধাত্বকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয় প্রবেশধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বিজ্ঞানের এ অগ্রযাত্রায় কোন দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে।
সবার জন্য ন্যাজ্য এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং এর দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায় এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। মাননীয় সভাপতি বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে এই উত্তোরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতন বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অন্যের উপরে নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা এবং সম্প্রসারণ কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি। কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে বিশ্ব সমাজকে টিকতে হলে অবশ্যই একের প্রতি অন্যের সহায়তা সহমর্মিতা সহযোগিতা অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসা সামগ্রী এবং রোগ নির্ণয় সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি। যাতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়। মাননীয় সভাপতি রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ স্বনির্ভর কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যে রাষ্ট্রের দলমত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে নিশ্চিন্তে নিরাপদে সমান অধিকার। সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে। মাননীয় সভাপতি গণতন্ত্র মানবাধিকার সুশাসন জবাবদিহিতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার ব্যবসা এবং বিনিয়োগের পরিবেশবান্ধব একটি নিরাপদ এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অংশীদারিত্ব, উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে নির্ভিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে। নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে। প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে। সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি সবার আগে বাংলাদেশ সবার জন্য বাংলাদেশ। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সকল নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি পুনরায় বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে আমার বক্তব্য শেষ করছি। মাননীয় সভাপতি আপনাকে ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
![]()