জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের পাশাপাশি একটি মানবিক ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তাঁর ভাষ্য, চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থ ও সম্ভাবনাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বুধবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন। তিনি জানান, চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছিল। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মিলে প্রায় ৫০টি পৃথক বৈঠকে অংশ নেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকের সংখ্যা ৮০টির বেশি।
মাহ্দী আমিন বলেন, সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তির মতো বিষয় তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠনে সরকারের ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন—কৌশলের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড ও ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও বিশ্বনেতাদের জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আটটি কর্মসূচি সরাসরি জাতিসংঘ সদর দপ্তরের মূল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ, অধিবেশনে ভাষণ, জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজিত প্রাতরাশ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আয়োজিত সংবর্ধনায় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।
জলবায়ু ও পরিবেশ ইস্যুও সফরে গুরুত্ব পেয়েছে। দুটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন বলে জানান মাহ্দী আমিন। একই সঙ্গে গ্রিন ফ্যাক্টরি বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্য নিয়েও বাংলাদেশের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। মাহ্দী আমিন জানান, এ বিষয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো, স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন থেকে বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং নাগরিকদের ই-হেলথ কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজিত অনুষ্ঠানে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে পাঁচ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের দায়িত্বের বিষয়টিও সেখানে তুলে ধরা হয়।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রফতানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জনশক্তি রফতানি ও বিনিয়োগ নিয়ে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা এবং বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমানবহর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
সফরে প্রযুক্তি ও শিল্প খাতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগও ছিল। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি দলের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে ক্যালিফোর্নিয়া সফর করে প্রযুক্তি, শিল্প ও একাডেমিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে কার্যক্রম চালিয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি কয়েকটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং নারী নেতৃত্ববিষয়ক বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
মাহ্দী আমিন বলেন, জাতিসংঘ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়গুলোও বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।![]()