বাংলাদেশের করপোরেট অঙ্গনে ইয়াসির আজমান একটি পরিচিত নাম। দেশের সাধারণ শিক্ষা ধারার একজন শিক্ষার্থী থেকে দেশের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার আসনে পৌঁছানোর যাত্রা তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট নেতৃত্বে।
ইয়াসির আজমানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকার কাকলি হাইস্কুলে। পরে তিনি ঢাকা কলেজ ও আবুজর গিফারী কলেজে অধ্যয়ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিজনেস স্কুল এবং ফ্রান্সের ইনসিয়াদের নির্বাহী শিক্ষা কার্যক্রমেও অংশ নেন।
কর্মজীবনের শুরু ব্যাংকিং খাতে। ১৯৯৯ সালে এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে করপোরেট জগতে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশে যোগ দিয়ে সেলস, ডিস্ট্রিবিউশন ও ট্রেড মার্কেটিংয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই বিক্রয় ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা পরিচালনায় তাঁর দক্ষতা বিকশিত হয়।
২০০৫ সালে গ্রামীণফোনে যোগ দেন ইয়াসির আজমান। সেলস বিভাগের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে কাজ করেন। পরবর্তীতে টেলিনর ইন্ডিয়ার ওড়িশা ও কর্ণাটক সার্কেলে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সার্কেল বিজনেস হেড হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এছাড়া টেলিনর গ্রুপের ডিস্ট্রিবিউশন ও ই-বিজনেস বিভাগের প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন।
আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে তিনি গ্রামীণফোনে ফিরে আসেন এবং চিফ মার্কেটিং অফিসারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দুই বছর পর ডেপুটি সিইও পদে উন্নীত হন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তর থেকেই উঠে এসে শীর্ষ পদে পৌঁছানোয় তিনি গ্রামীণফোনের প্রথম বাংলাদেশি ‘হোমগ্রোন’ সিইও হিসেবে পরিচিতি পান।
বেতন-ভাতা নিয়ে জনপরিসরে নানা আলোচনা থাকলেও ইয়াসির আজমানের ব্যক্তিগত পারিশ্রমিকের নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশিত নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাকরি ও বেতনভিত্তিক তথ্যভান্ডারে গ্রামীণফোনের সিইও পদের জন্য বার্ষিক প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার মার্কিন ডলারের একটি আনুমানিক বেতনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর মূল্য বছরে প্রায় ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং মাসে প্রায় ১৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ। তবে এটি সংশ্লিষ্ট পদের একটি অনুমানভিত্তিক হিসাব; গ্রামীণফোন বা ইয়াসির আজমানের ব্যক্তিগত বেতনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক তথ্য নয়।
বর্তমানে ইয়াসির আজমানের নেতৃত্বে গ্রামীণফোন শুধু একটি টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতা উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী থেকে দেশের অন্যতম বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পৌঁছানোর গল্প তাই অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।![]()