জিয়া হত্যাকাণ্ড: যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও ইতিহাস খুঁজছে
রাজু আলীম
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যেগুলোর বিচার হয়, শাস্তিও কার্যকর হয়, কিন্তু ইতিহাসের আদালতে সেই ঘটনার শুনানি শেষ হয় না। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তেমনই একটি ঘটনা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ছিল না; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী এবং রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়া একটি মোড়ও ছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় বিচার হয়েছে, সামরিক আদালতে দণ্ড কার্যকর হয়েছে, কিন্তু ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য বৃহত্তর পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।
এই কারণেই জিয়া হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি হত্যামামলা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের স্মৃতি, ইতিহাসের দায় এবং সত্য অনুসন্ধানের প্রশ্ন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়। পরে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসবিদ, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলেছেন—জিয়ার হত্যাকাণ্ড কি কেবল একটি সামরিক বিদ্রোহ ছিল, নাকি এর পেছনে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করেছিল?
এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর আজও রাষ্ট্রের কাছে নেই।![]()
এটি সত্য যে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিচার হয়েছিল। সামরিক আইনে বিচার শেষে কয়েকজন কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। কিন্তু বহু আইনবিদের মতে, সেই বিচার মূলত সেনা বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে পরিচালিত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি হত্যার বৃহত্তর ষড়যন্ত্র, সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা অন্য কোনো পক্ষের সম্পৃক্ততা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান কখনোই জনসমক্ষে আসেনি। এ কারণেই প্রায় চার দশক পরও জিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশ্নের অবসান হয়নি।![]()
এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত বই, স্মৃতিকথা, গবেষণা নিবন্ধ এবং সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে নানা অসঙ্গতির কথা। সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও গবেষকদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, সরকারি বর্ণনার বাইরে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুসন্ধানের দাবি রাখে। আবার অন্য গবেষকেরা এসব দাবিকে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। অর্থাৎ, বিতর্কের অস্তিত্ব রয়েছে; কিন্তু বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
এই অমীমাংসিত অবস্থাই সমস্যার মূল।![]()
একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস যখন অস্পষ্ট থেকে যায়, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে গুজব, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। ফলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস শেখে গবেষণা থেকে কম, রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বেশি। এটি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
জিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনায় আরেকটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—মেজর জেনারেল আবুল মনজুরের মৃত্যু। জিয়ার হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আটক হন এবং পরে নিহত হন। সরকারি ব্যাখ্যা ছিল, পালানোর চেষ্টা করলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন লেখক, সাংবাদিক এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা এই ঘটনার সরকারি ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, মনজুর জীবিত অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ বিচার হলে হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারত। অন্যদিকে, এ দাবির বিপরীতে সরকারি অবস্থানও ছিল সুস্পষ্ট। ফলে এখানেও সত্য ও বিতর্ক পাশাপাশি অবস্থান করছে।![]()
একইভাবে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর প্রস্তুত হওয়া বিভিন্ন সরকারি নথি, সাক্ষ্য এবং তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্যের একটি বড় অংশ কখনো জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। এ নিয়েও নানা সময় প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন, যাতে গবেষক ও ইতিহাসবিদরা স্বাধীনভাবে ঘটনাগুলো মূল্যায়ন করতে পারেন। তবে এসব দাবি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তার স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
জিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হলো—ঘটনার পর রাষ্ট্র কি কেবল বিচার করেছে, নাকি সত্য অনুসন্ধানেরও চেষ্টা করেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।![]()
অনেক দেশেই দেখা গেছে, বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম বিচারই শেষ কথা হয়ে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে নতুন কমিশন হয়েছে, গোপন নথি প্রকাশ করা হয়েছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, এমনকি কয়েক দশক পরও নতুন তথ্য সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী সত্য কমিশন কিংবা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন সামরিক শাসনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরবর্তী অনুসন্ধান—এসব উদাহরণ দেখায়, ইতিহাসের অনুসন্ধান আদালতের রায়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না।
বাংলাদেশে সেই ধরনের একটি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক অনুসন্ধান কি কখনো হয়েছে?
অনেক গবেষকের মতে, হয়নি।
এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে। তাঁদের যুক্তি, কমিশনের কাজ কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে দায়ী করা নয়; বরং বিদ্যমান নথি, সাক্ষ্য, সামরিক দলিল, সরকারি রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য একত্র করে একটি গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক বিবরণ তৈরি করা।
অবশ্য এর বিরোধিতাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এত বছর পর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক সাক্ষী আর জীবিত নেই। বহু নথি হয়তো হারিয়ে গেছে। স্মৃতি ম্লান হয়ে গেছে। ফলে নতুন তদন্ত প্রত্যাশার চেয়ে বিতর্কই বেশি তৈরি করতে পারে।
এই যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কিন্তু আরেকটি প্রশ্নও থেকে যায়—কঠিন বলেই কি সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা বন্ধ থাকবে?
ইতিহাসের বিচারে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রত্যেক বছর পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য সাক্ষ্য কমে যায়। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হারিয়ে যায়। নথি নষ্ট হয়। ফলে যদি কোনো অনুসন্ধান করার প্রয়োজন থাকে, তবে সেটি আজই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তাঁর শাসনামলের সমালোচনাও রয়েছে। আবার তাঁর অবদান নিয়ে বিস্তৃত মূল্যায়নও রয়েছে। কিন্তু একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সত্য জানার অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; এটি পুরো জাতির অধিকার।
এই কারণেই বিষয়টিকে দলীয় রাজনীতির বাইরে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় বিবরণ অনুযায়ী, একদল সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন। পরে সামরিক আদালতে বিচার হয়। একাধিক কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন এবং কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে সামরিক হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের এই মামলাকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু এখানেই ইতিহাসের প্রশ্ন শুরু।
অনেক আইনবিদ, গবেষক এবং সামরিক ইতিহাস বিশ্লেষকের মতে, যে বিচার হয়েছিল তা মূলত সেনা বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সামরিক আইনের বিচার। রাষ্ট্রপতি হত্যার পেছনের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, গোয়েন্দা তথ্যের ব্যর্থতা কিংবা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য অনুসন্ধান হয়নি—এমন মত দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এই কারণেই বিচার শেষ হলেও বিতর্ক শেষ হয়নি।
জিয়াউর রহমানের শাসনামল নিজেই ছিল অস্থিরতার মধ্যে আবদ্ধ। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে বিভাজন, ধারাবাহিক অভ্যুত্থানচেষ্টা, বিদ্রোহ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছিল। ১৯৭৭ সালেও একাধিক বিদ্রোহ ও কঠোর সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, সেই অস্থিরতার ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত ১৯৮১ সালের ঘটনাকে প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, কেবল অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দিয়ে পুরো ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। রাষ্ট্রপতির হত্যার পর যেসব গোয়েন্দা প্রতিবেদন, সামরিক নথি, যোগাযোগের রেকর্ড বা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর কতটুকু জনসমক্ষে এসেছে? ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথি দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকলে গবেষণাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ফলে একটি ঘটনার চারপাশে নানা ব্যাখ্যা জন্ম নেয়, কিন্তু সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে জিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে আজও অন্তত তিনটি বড় ধারা দেখা যায়।
প্রথম ধারা মনে করে, এটি ছিল সেনাবাহিনীর একটি বিদ্রোহ, যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং ইতিহাসের রায়ও মূলত সেখানেই শেষ।
দ্বিতীয় ধারা মনে করে, ঘটনার পেছনে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল, যা কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি।
তৃতীয় ধারা মনে করে, নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচলিত থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশই নির্ভরযোগ্য প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত নয়; তাই নতুন অনুসন্ধান হলেও সেটি হতে হবে সম্পূর্ণ প্রমাণনির্ভর।
এই তিনটি অবস্থানের মধ্যে একটি বিষয়ে বিস্ময়কর মিল রয়েছে—ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অসাধারণ গুরুত্ব বহন করে।
বিগত চার দশকে বিভিন্ন সাংবাদিক, গবেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও লেখক তাঁদের বই ও নিবন্ধে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ সামরিক কমান্ড কাঠামোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে, কেউ গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকারিতা নিয়ে। আবার কেউ কেউ আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে এসব দাবির অনেকগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। সেই কারণেই সেগুলো ইতিহাসের বিতর্ক হিসেবে রয়ে গেছে, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।
এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয়, যখন তথ্যের জায়গা দখল করে অনুমান। তখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ঘটনার একাধিক সংস্করণ শুনতে থাকে। কেউ বই থেকে শেখে, কেউ দলীয় বক্তব্য থেকে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ, দলিলভিত্তিক বিবরণ অনুপস্থিত থাকলে বিভ্রান্তিই স্থায়ী হয়।
বিশ্বের অনেক দেশ এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জন এফ. কেনেডি হত্যাকাণ্ডের পর একাধিক তদন্ত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী সময়ে সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠন করেছে। লাতিন আমেরিকার বহু দেশ সামরিক শাসনের সময়কার গুম ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে দশকের পর দশক পরে নতুন অনুসন্ধান চালিয়েছে। কারণ তারা বুঝেছিল, বিচার একটি বিষয়, আর ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ দলিল তৈরি আরেকটি বিষয়।
বাংলাদেশেও সেই প্রশ্ন এখন প্রাসঙ্গিক।
জিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে যদি কোনো নতুন অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে তার লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্য অনুসন্ধান, রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি রাষ্ট্রকে প্রমাণ ছাড়া দায়ী করা যেমন অনুচিত, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে উত্থাপিত যৌক্তিক প্রশ্নগুলোও উপেক্ষা করা উচিত নয়।
এখানে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী মারা গেছেন। অনেক নথি হয়তো আর পাওয়া যাবে না। স্মৃতি দুর্বল হয়েছে। ফলে শতভাগ সত্য হয়তো আর কখনো জানা সম্ভব হবে না। কিন্তু তাই বলে যতটুকু জানা সম্ভব, ততটুকুও জানার চেষ্টা না করা রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক চরিত্র। স্বাধীনতার যুদ্ধ, রাষ্ট্রগঠন, বহুদলীয় রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সত্য জানার অধিকার কোনো দলের নয়; এটি পুরো জাতির অধিকার।
আজও ইতিহাসের গবেষকরা বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন। কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন দুর্বলতা ছিল? কেন ঘটনাপরবর্তী অনেক সিদ্ধান্ত এত দ্রুত নেওয়া হয়েছিল? কেন কিছু বিতর্ক কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি? কেন বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও সরকারি বিবরণের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে ইতিহাস আরও পরিষ্কার হতে পারত।
সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার সেই কারণেই শুধু একটি আইনি ঘটনা নয়; এটি বহু পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এই সুযোগকে কেবল বিচারিক অগ্রগতি হিসেবে নয়, ইতিহাসের দলিল পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
সবশেষে একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাস কখনো গুজবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। আবার অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপরও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ইতিহাসের ভিত্তি হতে হয় দলিল, সাক্ষ্য, যাচাইযোগ্য তথ্য এবং নিরপেক্ষ অনুসন্ধান।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই নিজের অতীতকে নির্ভয়ে মূল্যায়ন করতে চায়, তাহলে জিয়া হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো নিয়ে গবেষণা, নথি উন্মুক্তকরণ এবং তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করতেই হবে। কারণ একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র কঠিন প্রশ্নকে ভয় পায় না; বরং সেগুলোর উত্তর খোঁজে।
চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বিচার হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস এখনো অপেক্ষা করছে—রায়ের জন্য নয়, সত্যের জন্য।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব