ডারউইনের গরমে চার দিন আগে যে বাংলাদেশকে খুব বেশি কেউ হিসাবের মধ্যে রাখেনি, শেষ পর্যন্ত সেই দলই অস্ট্রেলিয়ার মাঠে দাঁড়িয়ে লিখল নতুন ইতিহাস। মারারা ওভালে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ পেল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে এসে এমন সাফল্য নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বড় মুহূর্ত।
ম্যাচ শুরুর আগের ছবিটা অবশ্য এতটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছে বাংলাদেশ হেরেছিল ইনিংস ও ৩৮ রানে, এমনকি এক ইনিংসে ৫৪ রানেও অলআউট হয়েছিল। অথচ মূল ম্যাচে মাঠে নামার পর সেই বাংলাদেশকে দেখা গেল একেবারে অন্য চেহারায়।
টস জিতে ব্যাট করা অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে থামিয়ে দেওয়ার শুরুটা করেছিলেন হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে তাঁর শিকার ছয় উইকেট। এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন তরুণ তানজিদ হাসান। ১৯৭ বলে ১০১ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হয়ে গেলেন তানজিদ। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানও বাংলাদেশের ৪২৬ রানের সংগ্রহ গড়তে বড় ভূমিকা রাখে।
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল। ক্যামেরন গ্রিনের সেঞ্চুরি তাদের আশাও দেখিয়েছিল। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণিতে আবারও চাপে পড়ে স্বাগতিকরা। ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস থামিয়ে দেন তিনি। ম্যাচে হাসান মাহমুদের মোট উইকেট দাঁড়ায় ৯টি। অস্ট্রেলিয়া অলআউট হয় ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে তখন লক্ষ্য মাত্র ৫৭।
শেষ দিনের লড়াই তাই ছিল ইতিহাসের সঙ্গে বাংলাদেশের সাক্ষাৎ। তানজিদ দ্রুত ফিরে গেলেও শাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক আর কোনো বিপদ হতে দেননি। ১৪.২ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। স্কোরবোর্ডে ব্যবধান ৯ উইকেট, কিন্তু এই ব্যবধানের ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের বহু বছরের অপেক্ষা।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই জয়কে বিশেষ করে তুলেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মানসিক দৃঢ়তাও। ম্যাচের আগে পরপর হতাশাজনক খবর ছিল। মাঠে নামার পর নিজেদের কাজটুকু ঠিকঠাক করেছে দলটি। তানজিদের ব্যাট, হাসানের গতি, মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য—সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে চার দিনের মধ্যেই ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছে বাংলাদেশ।
কখনো কখনো ক্রিকেটে একটি জয় কেবল পরিসংখ্যান থাকে না। ডারউইনের জয়ও তেমন। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ড আর এবার অস্ট্রেলিয়া—বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পথচলায় আরেকটি বড় দরজা খুলল। 
আর এই জয়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা হয়তো সামনে। বাংলাদেশ কি এমন জয়কে নিয়মিত সাফল্যে পরিণত করতে পারবে? উত্তর সময় দেবে। তবে ডারউইনে অন্তত একটা কথা পরিষ্কার হয়েছে—অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ এখন শুধু লড়াই করতে আসে না, জিততেও আসে।