ডিজেলনির্ভরতা কমিয়ে দেশের রেল যোগাযোগকে বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থায় নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর করিডোর দিয়ে। এ জন্য ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।
‘নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় রেললাইনের ওপর ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে ওপরের বৈদ্যুতিক লাইন থেকে ট্রেনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে দেশের প্রচলিত রেলব্যবস্থায় মূলত ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্রেন ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় ওই নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিদ্যুৎচালিত ট্রেন পরিচালনার অবকাঠামো তৈরি হবে।
প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি করে কোচ নিয়ে মোট ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) ট্রেন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রেনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুর প্রান্তে একটি আধুনিক ইএমইউ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানাও নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের কাজ ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে আরও বেশি ধরা হয়েছিল। প্রাথমিক প্রস্তাবে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। গত এপ্রিলে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যয় পর্যালোচনা ও যৌক্তিকীকরণের পর ৪৬০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কমানো হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১২ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
চূড়ান্ত ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৯৪২ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বাকি ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে নেওয়া হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্রেনের তুলনায় পরিচালন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক ট্রেনের গড় গতি ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রেনগুলো ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করতে পারবে। ফলে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও জয়দেবপুরের মধ্যে যাতায়াতের সময়ও কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজধানীর সঙ্গে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের রেল যোগাযোগ দ্রুততর হলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর করিডোরটি দেশের ব্যস্ততম রেলপথগুলোর একটি। রাজধানীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের পাশাপাশি এ অঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও রেল যোগাযোগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই করিডোরে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু হলে এর প্রভাব শুধু রেল পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেলচালিত ট্রেনের পরিবর্তে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন ব্যবহার করা হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমবে। একই সঙ্গে রেল পরিবহনে কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ কমানো গেলে সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বৈদ্যুতিক রেলে রূপান্তরের ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিচালন সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেছেন, বৈদ্যুতিক রেল চালু রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং এ প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন। তার মতে, অতীতে ডেমু ট্রেন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ব্যবস্থায় শুরু থেকেই দক্ষ জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের রেলব্যবস্থায় বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনের ব্যবহার এখনও নেই বললেই চলে। অধ্যাপক হাদিউজ্জামানের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং চীনে প্রায় ৯৫ শতাংশ ট্রেন বিদ্যুতে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই রূপান্তর সময়সাপেক্ষ হলেও এর জন্য এখনই অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন।
এ প্রকল্পের আরেকটি তাৎপর্য হলো, এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট রুটে ট্রেনের জ্বালানি পরিবর্তনের উদ্যোগ নয়; বরং দেশের বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্ককে ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনের আওতায় আনার সম্ভাব্য প্রথম ধাপ। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর অংশে উদ্যোগটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেনলাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানিয়েছেন, পুরো রেলব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং রেল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। রেলের সক্ষমতা বাড়াতে আরও প্রকল্প নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
তবে প্রকল্পটির বাস্তব সুফল নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, নির্ধারিত সময়ে বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ট্রেন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি নতুন ইএমইউ ট্রেনের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের ব্যবস্থাও শুরু থেকেই পরিকল্পনায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশের রেলব্যবস্থায় ডিজেল থেকে বিদ্যুতে রূপান্তরের এই উদ্যোগ তাই একটি বড় অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুরের ৫২ কিলোমিটার পথে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকার বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাওয়া এই পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপ হবে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং এর পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের জুনে কাজ শেষ হলে দেশের প্রচলিত রেল নেটওয়ার্কে বৈদ্যুতিক ট্রেনের ব্যবহার বাস্তব রূপ পাবে।
![]()