দীর্ঘদিন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে থাকা ভারতকে পেছনে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের হিসাবে দুই দেশের বাণিজ্যের ব্যবধানও বেশ বড়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য হয়েছে ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। ফলে প্রায় ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র উঠে এসেছে দ্বিতীয় অবস্থানে। চীন এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার।
বাংলাদেশের বাণিজ্য অংশীদারদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এই উত্থানের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দেশটি থেকে আমদানি বৃদ্ধি। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য কমেছে। ফলে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য অবশ্য এখনো মূলত বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর। গত অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় এই উদ্বৃত্ত কমেছে, কারণ আমদানি দ্রুত বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি পণ্যের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গম, জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের পাশাপাশি শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ের কিছু ক্রয়ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল প্রায় ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেশি। তবে একই সময়ে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ফলে সামগ্রিক বাণিজ্য প্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্য অংশীদারের তালিকায় এই পরিবর্তনকে শুধু একটি পরিসংখ্যানগত অবস্থান বদল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব যে বাড়ছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোর তথ্যেও তার প্রতিফলন রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের চার মাসেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। জুনে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, আর ভারতের অংশ ছিল ৯ দশমিক ০২ শতাংশ।
তবে এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আমদানি-রপ্তানির ভবিষ্যৎ প্রবণতা, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের অগ্রগতির ওপর। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিও বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য অংশীদারত্বের অবস্থানকে প্রভাবিত করবে।![]()