বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সবসময়ই একরকম সরল বা একপাক্ষিক ছিল না। এটি সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করেছে। কখনো ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে, কখনো দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কখনো সহযোগিতার দরজা খুলেছে, আবার কখনো সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য কিংবা রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় কখনো বদলায়নি—দুই দেশ পাশাপাশি আছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ একে অন্যের বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি আলাদা নয়।
এই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে এটিই তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ। ফলে বৈঠকটিকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বিনিময় হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কমিয়ে দেখা হবে। বরং এটি দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর যোগাযোগ পুনর্গঠনের একটি সম্ভাব্য সূচনা।
কূটনীতিতে সব দরজা একসঙ্গে খুলে যায় না। কখনো একটি সৌজন্য সাক্ষাৎই পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করে। আবার একটি ছোট বৈঠক থেকেই বড় কোনো সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশের উচিত এই যোগাযোগকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো। ভারতেরও উচিত বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্মান করে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা।
গত দুই বছরে দুই দেশের সম্পর্ক যে স্বস্তিকর অবস্থায় ছিল না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে দ্রুত টানাপোড়েন তৈরি হয়। ভিসা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা, সীমান্তে উত্তেজনা, কূটনৈতিক পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও তলব, রাজনৈতিক মন্তব্য এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সম্পর্ককে জটিল করেছে।
এর প্রভাব শুধু দুই দেশের সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাধারণ মানুষও এর ভুক্তভোগী হয়েছে। ভারতের ভিসা পেতে সমস্যায় পড়েছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও পর্যটক। ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহন ও আমদানির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছেন। সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গিয়ে আঘাত করেছে।
এখানেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—পররাষ্ট্রনীতি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি রাষ্ট্রীয় কৌশল। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকলে সেটি নিয়ে আবেগ প্রকাশ করা যায়, প্রতিবাদ করা যায়, আপত্তি জানানো যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে হিসাব করতে হয় কোন সিদ্ধান্তে তার জনগণের সবচেয়ে বেশি লাভ হবে।
বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তববাদী হিসাব জরুরি।
ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই—এটি সত্য। কিন্তু সেই বন্ধুত্বের অর্থ নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়। আবার ভারতের সঙ্গে মতবিরোধ আছে—এটিও সত্য। কিন্তু সেই মতবিরোধের অর্থ স্থায়ী শত্রুতা তৈরি করা নয়।
একটি পরিণত পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি এখানেই। যেখানে প্রয়োজন সহযোগিতা, সেখানে সহযোগিতা; যেখানে অধিকার রক্ষার প্রশ্ন, সেখানে দৃঢ়তা; আর যেখানে মতপার্থক্য, সেখানে আলোচনা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো ভৌগোলিক নৈকট্য। ভারত বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে থাকা প্রতিবেশী। দুই দেশের সীমান্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার। রয়েছে ৫৪টি অভিন্ন নদী। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা রয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে যোগাযোগের সম্ভাবনা রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার প্রশ্নেও দুই দেশকে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে হয়।
অর্থাৎ বাংলাদেশ চাইলেই ভারতকে উপেক্ষা করতে পারবে না। একইভাবে ভারতও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করে তার পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশল বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
এই পারস্পরিক প্রয়োজনই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শক্তি। কিন্তু সেই শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
বাংলাদেশের কাছে কয়েকটি বিষয় দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত। সীমান্ত হত্যা তার একটি। সীমান্তে মানুষের প্রাণহানি কোনোভাবেই স্বাভাবিক সম্পর্কের অংশ হতে পারে না। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকতে পারে, অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা চোরাচালান মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যুকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
পানি আরেকটি বড় প্রশ্ন। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। তিস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনের সঙ্গে তিস্তার পানি সরাসরি যুক্ত। তাই এটি শুধু একটি কূটনৈতিক ফাইল নয়; এটি কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের উচিত এসব বিষয়ে আবেগের পরিবর্তে তথ্য, আন্তর্জাতিক আইন, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আলোচনায় যাওয়া। ভারতকেও বুঝতে হবে, বাংলাদেশের পানির অধিকারকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় হিসেবে নয়, ন্যায্যতার বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভারসাম্য প্রয়োজন। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হলে ভারতের বাজারে আরও কার্যকর প্রবেশাধিকার দরকার। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, পণ্যের মানদণ্ড সহজ করা এবং স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো—এসব বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বাংলাদেশেরও নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের অর্থ কেবল আমদানি বাড়ানো নয়। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের নতুন কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক কূটনীতি। বিদেশি সম্পর্কের মূল্যায়ন করতে হবে কতটি চুক্তি হয়েছে তা দিয়ে নয়; বরং সেই চুক্তির ফলে বাংলাদেশে কত বিনিয়োগ এসেছে, কত কর্মসংস্থান হয়েছে, কত রপ্তানি বেড়েছে, কত মানুষের ভিসা সহজ হয়েছে এবং কতটা প্রযুক্তি দেশে এসেছে—এসব দিয়ে।
এই জায়গায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে হবে।
শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেই হবে না। সম্পর্ককে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশি রোগীর জন্য ভারতীয় চিকিৎসা ভিসা সহজ হওয়া, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হওয়া, ব্যবসায়ীদের ভ্রমণ ও পণ্য পরিবহন সহজ হওয়া—এসবই সম্পর্কের বাস্তব সূচক।
দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সাধারণ মানুষও। দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক বৈঠক যত গুরুত্বপূর্ণ, সীমান্তের মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, রোগী ও পর্যটকের অভিজ্ঞতাও তত গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি পেশাদার কূটনীতিক নন; ভারতের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একজন রাজনীতিককে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোকে তাই একটি বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা যায়।
গত ২৫ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করে ঢাকায় ভারতের ১৬তম হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বাংলাদেশি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর একাধিক বৈঠক হয়েছে। ধীরে ধীরে ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে সম্পর্কের পথে বাধাও কম নয়। সীমান্তে পুশইন, সীমান্ত হত্যা এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করছে। এসব বিষয়ে আবেগ দিয়ে নয়, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে বিকল্প সম্পর্ক তৈরি করা দরকার, কিন্তু কাউকে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়। চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্যগুলোর একটি। জাপান উন্নয়ন ও অবকাঠামো সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের বড় উৎস।
বাংলাদেশের উচিত সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা। কোনো একটি শক্তির বলয়ে নিজেকে আটকে না রেখে বহুমাত্রিক কূটনীতি গড়ে তোলা। ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক যেমন দরকার, তেমনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রয়োজন।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অর্থ এটাই।
বাংলাদেশ ফার্স্ট মানে ভারতবিরোধিতা নয়। বাংলাদেশ ফার্স্ট মানে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিরোধিতাও নয়। এর অর্থ হলো—প্রথমে বাংলাদেশ। দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এই নীতির অধীনে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারে। বরং করা উচিত। কারণ প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতার ভিত্তিতে।
ভারতের কাছেও এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নতুন চোখে দেখার। বাংলাদেশকে ছোট প্রতিবেশী হিসেবে নয়, সমমর্যাদার রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব দিয়ে বিচার করলে সম্পর্ক আরও জটিল হবে। বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সম্মান করাই দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্যও বেশি লাভজনক।
একইভাবে বাংলাদেশেরও বুঝতে হবে, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যাবে না। বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনোভাবেই ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী বা নিরাপত্তাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হতে দেওয়া উচিত নয়। আবার ভারতের ভূখণ্ডও যেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র না হয়—এ প্রত্যাশাও যৌক্তিক।
দুই দেশের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এ ধরনের পারস্পরিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রথম শর্ত হলো যোগাযোগ। তারপর প্রয়োজন ধারাবাহিক আলোচনা। এরপর প্রয়োজন দৃশ্যমান ফলাফল।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই তিনটি জিনিস।
প্রথমত, নিয়মিত রাজনৈতিক যোগাযোগ। দ্বিতীয়ত, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক আলোচনা। তৃতীয়ত, মানুষের জন্য সম্পর্কের সুফল দৃশ্যমান করা।
গঙ্গা ও তিস্তার পানি, সীমান্ত হত্যা, পুশইন, বাণিজ্য ঘাটতি, ভিসা, জ্বালানি, যোগাযোগ—প্রতিটি ইস্যুকে আলাদা করে আলোচনার টেবিলে আনতে হবে। কোনো একটি বিষয় নিয়ে অগ্রগতি না হলে অন্য সব সম্পর্ক আটকে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আবার কোনো একটি খাতে সহযোগিতা হচ্ছে বলে অন্যায্যতার বিষয়গুলোও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
কূটনীতি মানে একসঙ্গে সব সমস্যার সমাধান নয়। কূটনীতি হলো সমস্যাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ধীরে ধীরে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক তাই আশার একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এটিকে সাফল্য বলা যাবে তখনই, যখন এই যোগাযোগ পরবর্তী সময়ে বাস্তব ফলাফলে রূপ নেবে।
বাংলাদেশের মানুষ বড় কোনো কূটনৈতিক ঘোষণা চায় না। তারা চায় সীমান্তে প্রাণহানি কমুক, ভিসা সহজ হোক, ব্যবসা সহজ হোক, রোগী ও শিক্ষার্থীর যাতায়াত স্বাভাবিক হোক, পানি নিয়ে ন্যায্য সমাধান হোক এবং দুই দেশের সম্পর্কের কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবন সহজ হোক।
ভারতের জনগণেরও একই ধরনের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। শান্তিপূর্ণ সীমান্ত, নিরাপদ যোগাযোগ, বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা—এসব দুই দেশের মানুষেরই স্বার্থ।
অতএব সামনে যাওয়ার পথ একটাই—বৈরিতা নয়, বাস্তববাদী সহযোগিতা।
বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে না অতীতের অন্ধ আবেগে আটকে থাকতে হবে, না ভবিষ্যতের ভয়কে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী কূটনীতি। এমন কূটনীতি, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন যাবে না; সহযোগিতা থাকবে কিন্তু অধিকার বিসর্জন যাবে না; সংলাপ থাকবে কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস হবে না।
ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক এমনই হওয়া উচিত—প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব, কিন্তু সমতার ভিত্তিতে; সহযোগিতা, কিন্তু পারস্পরিক স্বার্থে; সংলাপ, কিন্তু মর্যাদা বজায় রেখে।
সোমবারের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়তো সেই নতুন সমীকরণের প্রথম দৃশ্যমান ইঙ্গিত। এখন দেখার বিষয়, ঢাকা ও দিল্লি সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের সামনে অতীতের অনেক হিসাব আছে। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রয়োজন আরও বড়। সেই ভবিষ্যৎ যদি শান্তি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি, নিরাপত্তা ও মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
বন্ধুত্বের নামে একতরফা সুবিধা নয়, বিরোধিতার নামে বিচ্ছিন্নতাও নয়—বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন এক সম্পর্ক, যেখানে দুই দেশই লাভবান হবে এবং দুই দেশের মানুষই নিরাপদ, সম্মানিত ও স্বস্তিতে থাকবে।
এটাই হতে পারে নতুন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি। আর সেই সম্পর্কের মূলনীতি খুব সরল—বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু হতে চায়, কিন্তু কারও ছায়া হয়ে নয়; সমমর্যাদার প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবেই।